
কেউ মরতে মরতে বেঁচে থাকে। এবং সেটা টের পায় না।
শৈশব শেষ হওয়া কোনো ঘটনা না। কোনো দিন নেই, কোনো মুহূর্ত নেই, কোনো স্মৃতি নেই। শুধু একদিন খেলনার দোকানে গিয়ে দেখা যায় — কিছু চাইছে না মন। ফুল দেখে কিছু লাগছে না। বৃষ্টি পড়ছে, ভেতরে কিছু নেই। এই শূন্যতাটাই মৃত্যু। নীরব, অদৃশ্য, এবং অপরিবর্তনীয়।
মৃত্যু এভাবেই আসে। ছোট ছোট টুকরোয়।
প্রথমবার মিথ্যা বলা হলো। কাজ হলো। সেদিন একটা টুকরো গেল। বাবা একটা প্রশ্নের উত্তর জানলেন না — আরেকটা টুকরো। ভালো মানুষ খারাপ কাজ করল — আরেকটা। কেউ মারা গেল, এবং বোঝা গেল সে সত্যিই আর আসবে না — আরেকটা। প্রতিটা উপলব্ধি একটা করে টুকরো নিয়ে গেছে। এবং এতটাই ধীরে গেছে যে টের পাওয়া যায়নি।
শিশু পৃথিবী দেখে সাদা-কালোতে। ভালো আছে, খারাপ আছে — সহজ। কিন্তু একদিন দেখা যায় ভালো মানুষ ভয়ানক কাজ করছে, খারাপ মানুষ কাউকে বাঁচাচ্ছে। সেই দিনটার পর পৃথিবী আর কখনো সহজ হয় না। কারণ সত্যি হলো — পৃথিবী কোনোদিনই সহজ ছিল না। শুধু জানা ছিল না।
এবং না জানাটাই ছিল আসল সম্পদ।
শিশু বড় হতে চায়। কারণ সে ভাবে বড় মানে স্বাধীনতা। এটা জীবনের সবচেয়ে করুণ ভুল। বড় হওয়া মানে স্বাধীনতা না — বড় হওয়া মানে আরও গভীর খাঁচা। শিশু রাস্তায় বসে কাঁদতে পারে, দৌড়াতে পারে, চিৎকার করতে পারে — পৃথিবী কিছু বলে না। বড় হলে এর কোনোটাই করা যায় না। সব চেপে রাখতে হয়, সব মাপতে হয়, সব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই চেপে রাখার অন্য নাম পরিপক্কতা।
জ্ঞান বাড়লে সুখ বাড়ে — এই মিথ্যাটা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। আসলে উল্টো। শিশু কিছু জানে না তাই এখনে থাকতে পারে — এই মুহূর্তে, এই মাঠে, এই খেলায়। বড়রা সব জানে, তাই কোথাও থাকতে পারে না। অতীতের ভার, ভবিষ্যতের ভয় — এই দুইয়ের মাঝখানে বর্তমান বলে কিছু থাকে না। এবং বর্তমান না থাকলে বেঁচে থাকা আর না থাকা একই জিনিস।
লাল গাড়িটা ভেঙেছিল। প্রথমে আঁকড়ে ধরা হয়েছিল। তারপর আলমারিতে রাখা হয়েছিল। তারপর একদিন ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই তিনটা ধাপই শৈশবের মৃত্যু। আঁকড়ে ধরা মানে এখনো শিশু। রেখে দেওয়া মানে যাচ্ছে। ফেলে দেওয়া মানে শেষ।
এবং এই শেষটা আটকানোর কোনো উপায় নেই। কারণ পৃথিবীকে চিনলেই সেই প্রথম নির্দোষ দৃষ্টিটা চলে যায়। অজ্ঞতা ছিল যে আবরণ, সেটা একবার উঠলে আর নামে না।
ভেতরে একটা শিশু মরে পড়ে আছে। সবার ভেতরে। এবং সেই লাশটা বহন করেই বাকি জীবন হাঁটতে হয় — সেটা না জেনে, না বুঝে, না স্বীকার করে।
এটাকেই বলা হয় বড় হওয়া।

একটু ভাবনা রেখে যান