ব্লগ

যে সফলতা আমার বিষ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল অফিসে একটা প্রজেক্ট সফল হলে সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাল। সেই মুহূর্তে আমি যে উচ্ছ্বাস অনুভব করেছিলাম, সেটা ছিল নেশার মতো। কিন্তু আজ সকালে সেই অনুভূতি নেই। আমি আবার খুঁজছি পরবর্তী সফলতা, পরবর্তী প্রশংসা। এই যে ক্রমাগত “আরো” চাওয়া – এটা কি শেখা, নাকি আসক্তি?

পাঁচ বছর আগে একটা বড় প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়েছিল। সেই সময় আমি ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকে আমি যা শিখেছি – ধৈর্য, বিনয়, ভুল স্বীকার করার সাহস – সেগুলো আমার পরবর্তী সফলতার চেয়ে বেশি মূল্যবান প্রমাণিত হয়েছে।

রাস্তায় দেখি একজন রিকশাওয়ালা পাংচার হওয়া টায়ার ঠিক করছেন। তার মুখে হতাশা নেই, বিরক্তি নেই। শুধু ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সামান্য ব্যর্থতা তাকে থামায়নি, বরং সমাধানের পথ খুঁজতে শিখিয়েছে। আমি কি আমার বড় বড় সফলতা থেকে এত কিছু শিখেছি?

বাজারে দেখি একজন নতুন দোকানদার প্রথম দিনে তেমন বিক্রি করতে পারেননি। তিনি হতাশ, কিন্তু পরদিন আবার দোকান খুলেছেন। তার চেহারায় একটা নতুন কৌশলের আভাস। ব্যর্থতা তাকে ভাঙেনি, বরং নতুন পথ দেখিয়েছে।

চায়ের দোকানে বসে শুনি একজন তরুণ তার বন্ধুকে বলছে, “ভাই, চাকরির ইন্টারভিউ হয়নি। কিন্তু বুঝলাম আমার কোথায় কমতি।” তার কণ্ঠে দুঃখ আছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসও আছে। এই ব্যর্থতা তাকে আত্মজ্ঞান দিয়েছে।

আমার মনে হয়, সফলতা আমাদের একটা মিথ্যা নিরাপত্তা দেয়। আমরা ভাবি আমরা সবকিছু জানি, সবকিছু পারি। কিন্তু ব্যর্থতা আমাদের মুখোমুখি করায় আমাদের সীমাবদ্ধতার সাথে।

জামিউরের ব্যবসায় একবার বড় ক্ষতি হয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, “ভাই, এই ক্ষতি আমাকে শিখিয়েছে কোথায় সাবধান থাকতে হয়।” কিন্তু যখন তার ব্যবসা ভালো চলে, সে অহংকারী হয়ে ওঠে। সফলতা তাকে কী শিখিয়েছে?

সাইফুল কবির পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেছিল। সেই ব্যর্থতা তাকে আরো মনোযোগী, আরো পরিশ্রমী করেছিল। কিন্তু পাস করার পর সে আবার অবহেলা শুরু করেছিল।

আমার নিজের কথা ভাবি। আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এসেছে আমার সবচেয়ে কঠিন ব্যর্থতা থেকে। বাবার মৃত্যু, প্রথম চাকরি হারানোর ভয়, আরাশের অসুস্থতা – এইসব কষ্টের মুহূর্তে আমি নিজেকে চিনেছি। কিন্তু আমার সফলতার মুহূর্তে আমি কী শিখেছি?

মৃদুল কানাডায় যাওয়ার আগে কয়েকবার ভিসা রিজেক্ট হয়েছিল। সেই রিজেকশনগুলো তাকে আরো প্রস্তুত করেছিল, আরো দৃঢ় করেছিল। কিন্তু কানাডায় পৌঁছে সফল হওয়ার পর সে কি আরো বিনয়ী হয়েছে?

সমস্যা হলো, সফলতা আমাদের মধ্যে একটা নেশা তৈরি করে। আমরা সেই অনুভূতি বারবার চাই। আমরা ভুলে যাই যে সফলতা একটা গন্তব্য নয়, একটা মুহূর্ত মাত্র।

হাসপাতালে দেখি একজন ডাক্তার একটা অপারেশনে ব্যর্থ হওয়ার পর দুঃখিত। কিন্তু পরদিন তিনি আরো সতর্কতার সাথে কাজ করছেন। ব্যর্থতা তাকে আরো দক্ষ করেছে। কিন্তু সফল অপারেশনের পর তার কী শেখার আছে?

পার্কে দেখি একটা শিশু সাইকেল চালানো শিখছে। সে বারবার পড়ছে, বারবার উঠছে। প্রতিটা পতন তাকে ভারসাম্য শেখাচ্ছে। কিন্তু একবার সাইকেল চালানো শেখার পর সে কি আর শিখছে?

ট্রেনে দেখি একজন ব্যবসায়ী ফোনে বলছেন, “এবার লাভ হয়েছে। এখন আরো বড় প্রজেক্ট নেব।” সফলতা তাকে আরো ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু এই ঝুঁকি কি জ্ঞান থেকে, নাকি অহংকার থেকে?

আমার মনে হয়, ব্যর্থতা একটা কঠোর কিন্তু সৎ শিক্ষক। সে আমাদের কিছু লুকায় না, কিছু মিথ্যা বলে না। কিন্তু সফলতা একটা চাটুকার শিক্ষক। সে আমাদের ভুলিয়ে রাখে যে আমাদের আরো শেখার আছে।

ব্যর্থতা আমাদের বলে, “তুমি জান না।” সফলতা বলে, “তুমি সব জান।” ব্যর্থতা আমাদের মাটিতে রাখে, সফলতা আমাদের আকাশে ভাসায়।

কিন্তু সফলতা কি সবসময়ই খারাপ? নাকি সমস্যা আমাদের সফলতার প্রতি আসক্তিতে?

হয়তো প্রকৃত জ্ঞান হলো সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোকেই শিক্ষক হিসেবে দেখা। সফলতা থেকে কৃতজ্ঞতা শেখা, ব্যর্থতা থেকে বিনয় শেখা। সফলতায় উৎসাহ পাওয়া, কিন্তু আসক্ত না হওয়া।

আরাশের পরীক্ষায় ভালো নম্বর এলে আমি তাকে বলি, “চমৎকার, কিন্তু এটা শুধু শুরু।” খারাপ নম্বর এলে বলি, “এটা তোমাকে শেখাবে কোথায় আরো মনোযোগ দিতে হবে।” আমি চাই সে দুটো অভিজ্ঞতা থেকেই শিখুক।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো সফলতার নেশা থেকে মুক্ত থাকা। সফলতাকে উপভোগ করা, কিন্তু তার দাস না হওয়া। আর ব্যর্থতাকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করা, শত্রু হিসেবে নয়।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোর সাথেই শান্তিতে বাস করতে পারা। দুটোকেই সমান মর্যাদায় দেখতে পারা। দুটো থেকেই শিখতে পারা।

কারণ জীবনে দুটোই আসবে। আর দুটোই আমাদের পূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *