ব্লগ

মিথ্যা

নভেম্বর ২০২৫ · 11 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বস জিজ্ঞেস করল, “প্রজেক্টটা কেমন চলছে?”

আমি বললাম, “ভালো চলছে, স্যার।”

বস মাথা নাড়ল। বেরিয়ে গেল।

আমি জানালার দিকে তাকালাম। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। প্রজেক্টের ফাইলটা টেবিলে পড়ে আছে। লাল দাগ দেওয়া। ভুল হিসাব। ভুল পরিকল্পনা। তিন মাসের কাজ।

ফাইলটা খুললাম না।

চা ঠান্ডা হয়ে গেছিল। খাইনি।


রাতে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি কখনো মিথ্যা বল?”

হ্যাপি রান্নাঘরে ছিল। থালা ধোয়ার শব্দ।

আমি বললাম, “না। মিথ্যা বলা খারাপ।”

আরাশ তার খাতায় লিখল কিছু। স্কুলের হোমওয়ার্ক হবে হয়তো।

“তুমি পড়া শেষ করেছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“হ্যাঁ।”

তার খাতায় তিন পাতা খালি। আমি দেখতে পেলাম।

“ভালো,” আমি বললাম।


হ্যাপি বিছানায় শুয়ে ফোনে কিছু দেখছিল। নীল আলো তার মুখে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী দেখছ?”

“কিছু না।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঘুমিয়ে গেছ?”

“না।”

“আমার সাথে কথা বলবে?”

“কী বলব?”

চুপ। শুধু ফ্যানের শব্দ।

“কিছু না,” হ্যাপি বলল।

আমি জানতাম সে কী জিজ্ঞেস করতে চাইছিল। সে জানত আমি জানি। তবু কেউ কিছু বলল না।

পাশে ঘুরে শুয়ে আমি ভাবলাম, এটা কি ভালোবাসা? নাকি অভ্যাস?

জানি না।


জামিউর ফোন করল। “তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, জানিস?”

“তুইও আমার।”

“কাল একসাথে খেতে যাব?”

“হ্যাঁ, যাব।”

ফোন রাখলাম। মনে হলো কিছু একটা বলা দরকার ছিল। কিন্তু কী?

জামিউর জানে না আমার বাবা মারা গেছে পাঁচ মাস হলো। আমি বলিনি। সে কখনো জিজ্ঞেসও করেনি, “তোর বাবা কেমন আছে?”

হয়তো সে ভুলে গেছে আমার বাবা বেঁচে ছিল কিনা।


অফিসে ফারুক বলল, “তুমি সব সময় এত চুপচাপ কেন?”

“আমি চুপচাপ?”

“হ্যাঁ। কখনো তোমার মন খারাপ কিনা বোঝা যায় না।”

আমি হাসলাম। “আমি ভালো আছি।”

“সবাই ভালো আছে। কিন্তু আসলে কেউ ভালো নেই।” ফারুক সিগারেট ধরাল। “তাই না?”

“জানি না।”

ফারুক তাকাল আমার দিকে। তারপর চলে গেল।

আমি ভাবলাম, সে কি একটা উত্তর চেয়েছিল? নাকি শুধু কথা বলতে চেয়েছিল?


শুক্রবার নামাজে গেলাম। ইমাম সাহেব বললেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কষ্ট বোঝেন। তিনি সব কিছু জানেন।”

আমার পাশে একজন বুড়ো মানুষ। তার চোখে পানি।

আমি ভাবলাম, আল্লাহ কি সত্যিই জানেন? জানলে কেন চুপ থাকেন?

সেজদা দিলাম। মাথা মাটিতে। ঠান্ডা মেঝে।

মনে মনে কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু শব্দ পেলাম না।


আরাশ জিজ্ঞেস করল, “দাদু কোথায়?”

আমরা তিনজন খাচ্ছিলাম। হ্যাপি ভাত পরিবেশন করছিল।

“দাদু আর নেই।”

“মানে?”

“মারা গেছেন।”

আরাশ চামচ নামিয়ে রাখল। “কবে?”

“অনেকদিন আগে।”

“কেন বলোনি?”

আমি হ্যাপির দিকে তাকালাম। হ্যাপি আমার দিকে তাকাল।

“বলেছিলাম তো,” আমি বললাম।

“না। বলোনি।”

হয়তো বলিনি। মনে নেই।

“আচ্ছা,” আরাশ বলল। “দাদুকে আমার মিস হবে।”

তুমি দাদুকে চিনতে না। আমি বলতে চাইলাম। কিন্তু বললাম না।


রাতে আয়নায় মুখ দেখলাম। ক্ষুর করা দরকার। চোখের নিচে কালো দাগ।

আমি কে?

আয়নার মানুষটা জবাব দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।

হ্যাপি ঘরে ঢুকল। “তুমি কাকে দেখছ?”

“নিজেকে।”

“কেমন লাগছে?”

“অচেনা লাগছে।”

হ্যাপি আমার পাশে দাঁড়াল। আয়নায় দুজন মানুষ। দুজনেই চুপ।

“আমাকেও অচেনা লাগে,” হ্যাপি বলল।

“কাকে? নিজেকে?”

“না। তোমাকে।”

আমি কিছু বললাম না। কী বলা যায়?


পরের দিন অফিসে বস আবার এলো।

“প্রজেক্ট রিপোর্ট কোথায়?”

“স্যার, এটা… একটু সমস্যা আছে।”

“কী সমস্যা?”

আমি ফাইলটা খুললাম। লাল দাগ। ভুল হিসাব।

বস তাকাল। তারপর আমার দিকে।

“তুমি তো বলেছিলে সব ঠিক চলছে।”

“আমি ভেবেছিলাম…”

“তুমি কী ভেবেছিলে?”

জানি না। আমি আসলে কিছুই ভাবিনি।

বস বলল, “আগামীকাল সকালে আমার রুমে আসবে।”

বেরিয়ে গেল।

আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তায় পানি।

ফোনে হ্যাপিকে মেসেজ পাঠালাম: “আজ একটু দেরি হবে।”

হ্যাপি পাঠাল: “ঠিক আছে।”

ঠিক আছে মানে কী? সত্যিই ঠিক আছে? নাকি আরেকটা মিথ্যা?


রাতে বাড়ি ফিরলাম। সবাই ঘুমিয়ে গেছে।

রান্নাঘরে গেলাম। খাবার ঢেকে রাখা। গরম করলাম না। ঠান্ডাই খেলাম।

স্বাদ পেলাম না। শুধু গিললাম।

আরাশের ঘরের দরজা খোলা। ঢুকলাম। সে ঘুমাচ্ছে। বইটা খোলা। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে।

বইটা বন্ধ করে দিলাম। তার মাথায় হাত বুলালাম।

সে একটু নড়ল। “বাবা?”

“ঘুমাও।”

“তুমি কি সুখী?”

“কী?”

“তুমি কি সুখী, বাবা?”

আমি বসে রইলাম। উত্তর খুঁজলাম। পেলাম না।

“জানি না,” আমি বললাম।

আরাশ আবার ঘুমিয়ে পড়ল। নাকি জেগে শুনছিল?


বিছানায় হ্যাপির পাশে শুলাম।

সে জাগিয়ে দিল না। আমি জাগালাম না।

আমরা দুজনেই জেগে আছি। জানি। কিন্তু এমন ভান করছি যে ঘুমিয়ে আছি।

ফ্যানের শব্দ। রাস্তার গাড়ির শব্দ। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।

হ্যাপি বলল, “তুমি ঘুমিয়ে গেছ?”

“না।”

“আমার সাথে কথা বলবে?”

“হ্যাঁ।”

চুপ।

“কী বলব?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“জানি না।”

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম।

“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“সত্যি?”

আমি ঘুরে তার দিকে তাকালাম। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

“জানি না,” আমি বললাম।

হ্যাপি কাঁদল কিনা বুঝলাম না। সে নড়ল না। আমিও।

অনেকক্ষণ পর হ্যাপি বলল, “অন্তত সত্যি বলেছ।”

“এটা কি যথেষ্ট?”

“জানি না।”

আমরা আবার চুপ করে রইলাম।

ঘুম এলো না। শুধু সিলিং দেখে শুয়ে রইলাম।


পরের দিন সকালে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি আজ অফিসে যাবে?”

“হ্যাঁ।”

“যেতে চাও?”

“কী?”

“তুমি কি যেতে চাও অফিসে?”

আমি তাকালাম তার দিকে। এগারো বছরের একটা বাচ্চা। কিন্তু চোখদুটো কেমন যেন বুড়ো।

“জানি না,” আমি বললাম।

আরাশ মাথা নাড়ল। “আমিও স্কুলে যেতে চাই না। কিন্তু যাই।”

“কেন যাও?”

“জানি না। সবাই যায় তাই?”

আমি হাসলাম। তারপর হাসি থামল।

হ্যাপি চা নিয়ে এলো। “কী নিয়ে কথা হচ্ছে?”

“কিছু না,” আমি বললাম।

আরাশ স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “আজ কী হবে অফিসে?”

“জানি না। হয়তো চাকরি যাবে।”

“তারপর?”

“জানি না।”

হ্যাপি বসল। “তুমি ভয় পাচ্ছ?”

“হ্যাঁ।”

“ভালো।”

“কী?”

“ভালো যে তুমি সত্যি বললে।”

আমি চা খেলাম। গরম। জিভ পুড়ে গেল। কিছু বললাম না।


অফিসে গেলাম। বসের রুমে গেলাম।

বস বলল, “বসো।”

বসলাম।

“তুমি কেন মিথ্যা বলেছিলে?”

“আমি জানতাম না যে এটা এতটা খারাপ।”

“না। তুমি জানতে। তাই না?”

আমি তাকালাম বসের দিকে। চোখে চোখ।

“হ্যাঁ,” আমি বললাম। “জানতাম।”

বস মাথা নাড়ল। “কেন বলোনি?”

“ভয়।”

“কিসের ভয়?”

“জানি না।”

বস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি এই কাজটা করতে চাও?”

“না।”

“তাহলে কেন করছ?”

“জানি না। টাকার জন্য? পরিবারের জন্য? জানি না।”

বস হাসল। কিন্তু হাসিটা দুঃখের।

“তুমি জানো,” বস বলল, “আমিও চাই না এই কাজটা।”

আমি অবাক হলাম। “সত্যি?”

“হ্যাঁ। কিন্তু করছি। সবাই করছে। কেউ থামছে না।”

আমরা দুজনে চুপ করে বসে রইলাম।

“তুমি ইস্তফা দিতে পারো,” বস বলল।

“দেব?”

“জানি না। তোমার সিদ্ধান্ত।”

আমি বেরিয়ে এলাম।


রাস্তায় হাঁটছিলাম। দুপুর। গরম।

জামিউর ফোন করল। “কই তুই? খাব?”

“জামিউর, আমি তোর ভালো বন্ধু না।”

“কী বলছিস?”

“আমরা কখনো আসল কথা বলি না। আমরা শুধু একসাথে খাই। হাসি। চলে যাই।”

চুপ।

“তুই ঠিক আছিস?” জামিউর জিজ্ঞেস করল।

“না।”

“বল কী হয়েছে।”

“আমার বাবা মারা গেছে পাঁচ মাস আগে। তোকে বলিনি।”

চুপ।

“আমি জানতাম না,” জামিউর বলল। তার গলা কাঁপছিল। “কেন বলিসনি?”

“জানি না।”

“আমি… আমি কী বলব?”

“কিছু বলার দরকার নেই।”

ফোন রেখে দিলাম।

হাঁটতে লাগলাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না।


একটা পার্কে গিয়ে বসলাম। শিশুরা খেলছে। মায়েরা বসে দেখছে।

একটা বাচ্চা আমার কাছে এলো। “আঙ্কেল, আপনি কাঁদছেন?”

“না।”

“আপনার চোখে পানি।”

আমি মুছলাম। “ধুলো ঢুকেছে।”

বাচ্চাটা তাকাল। “আমার মা বলে, সত্যি বলতে হয়।”

“তোমার মা ঠিক বলে।”

“তাহলে আপনি সত্যি বলছেন না কেন?”

আমি হাসলাম। “তুমি কত বুদ্ধিমান।”

“আমার বয়স সাত।”

“বড় হয়ে কী হবে?”

“জানি না। আপনি কী?”

“আমি? আমিও জানি না।”

বাচ্চাটা দৌড়ে চলে গেল।

আমি বসে রইলাম।


সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম।

আরাশ আর হ্যাপি টিভি দেখছিল।

“তুমি এলে?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“খাবে?”

“না।”

আমি তাদের পাশে বসলাম। টিভিতে কোনো নাটক।

“বাবা,” আরাশ বলল, “আমি তোমাকে একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“আজ স্কুলে আমি মিথ্যা বলেছি।”

আমি তাকালাম তার দিকে। “কী বলেছিস?”

“টিচার জিজ্ঞেস করল হোমওয়ার্ক কই। আমি বললাম বাড়িতে ভুলে এসেছি। কিন্তু আসলে করিনি।”

হ্যাপি টিভি বন্ধ করে দিল।

“তুমি কেন বললে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“ভয় লাগছিল। টিচার রাগ করবে ভেবে।”

“এখন কেমন লাগছে?”

আরাশ ভাবল। “খারাপ লাগছে।”

আমি তাকে কাছে টানলাম। “আমিও আজ মিথ্যা বলেছি।”

“কাকে?”

“সবাইকে।”

আরাশ তাকাল আমার দিকে। “আমাকেও?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“জানি না। হয়তো ভয়।”

“আপনিও ভয় পান?”

“হ্যাঁ। অনেক।”

আরাশ আমার হাত ধরল। “বাবা, আমরা কি সত্যি বলা শুরু করতে পারি?”

“পারি চেষ্টা করতে।”

“কঠিন হবে?”

“হ্যাঁ। অনেক কঠিন।”

হ্যাপি আমার অন্য হাত ধরল। আমরা তিনজন বসে রইলাম।

টিভি বন্ধ। ফ্যানের শব্দ। রাস্তার গাড়ির শব্দ।

“বাবা,” আরাশ বলল, “আমরা কি সুখী?”

আমি তাকালাম হ্যাপির দিকে। হ্যাপি তাকাল আমার দিকে।

“জানি না,” আমি বললাম। “কিন্তু আমরা একসাথে আছি।”

আরাশ মাথা রাখল আমার কাঁধে। “এটা কি যথেষ্ট?”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

জানি না।

হয়তো জানি না।

হয়তো কখনো জানব না।

কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, তিনজন একসাথে বসে আছি।

এটা কি যথেষ্ট?

জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। একটু ঠান্ডা।

হ্যাপির হাত আমার হাতে। উষ্ণ।

আরাশের শ্বাস। নিয়মিত। শান্ত।

আমি বসে রইলাম।

চোখ খুললাম না।

শুধু বসে রইলাম।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *