ব্লগ

যে আয়নায় সময় ধরা পড়ে

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। আমি দেখছি তার মুখে একটা ছোট দাগ, যেটা গত বছর ছিল না। তার চোখের কোণে সূক্ষ্ম রেখা, যেগুলো আগে শুধু হাসলেই দেখা যেত।

আমি বুঝতে পারি—হ্যাপি বুড়িয়ে যাচ্ছে।

এই উপলব্ধিটা আমার বুকে একটা অদ্ভুত ব্যথা দেয়। কারণ হ্যাপি বুড়িয়ে গেলে আমিও বুড়িয়ে যাচ্ছি।

আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকাই। আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে। মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে। আমার পেট একটু বেরিয়ে এসেছে।

আমি কখন থেকে এমন হলাম?

বিয়ের সময় হ্যাপি কী সুন্দর ছিল। তার গালে টোল, চোখে উজ্জ্বলতা। আমিও তখন যুবক ছিলাম। আমার চুল ঘন, শরীর শক্ত।

পনেরো বছরে আমরা দুজনেই অন্য মানুষ হয়ে গেছি।

কিন্তু এই পরিবর্তন কি শুধু বাইরের? নাকি ভিতরেও আমরা বদলে গেছি?

হ্যাপি আগে অনেক স্বপ্ন দেখত। সে বলত, “একদিন আমাদের নিজের বাড়ি হবে। বড় একটা বাগান থাকবে।” এখন সে আর এই স্বপ্নের কথা বলে না। হয়তো সে বুঝে গেছে, এই স্বপ্নগুলো পূরণ হওয়ার নয়।

আমিও আগে ভাবতাম একদিন বড় লেখক হব। আমার বই প্রকাশিত হবে। মানুষ আমাকে চিনবে। এখন আমি জানি, এইসব ছোট স্বপ্ন। আমার মতো হাজারো মানুষ এই স্বপ্ন দেখে।

তাহলে কি আমরা দুজনেই আমাদের স্বপ্নের সাথে সাথে যৌবনও হারিয়েছি?

হ্যাপি আয়না থেকে সরে গেল। আমি তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“তুমি আজ কেমন লাগছ?” আমি জানি না কেন এই প্রশ্নটা করলাম।

হ্যাপি হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে এক টুকরো বিষাদ ছিল।

“আমি কেমন লাগছি জানি না। কিন্তু আমি যে বুড়ি হয়ে যাচ্ছি, সেটা জানি।”

আমি তার হাত ধরলাম। হ্যাপির হাত আগের মতো নরম নেই। একটু রুক্ষ হয়েছে।

“আমিও বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।”

“আমরা দুজনে একসাথে বুড়ো হচ্ছি।” হ্যাপি বলল।

এই কথাটা আমাকে একটা অন্যরকম শান্তি দিল। হ্যাঁ, আমরা একসাথে বুড়ো হচ্ছি। একা নয়।

কিন্তু একই সাথে আমার মনে একটা ভয়ও জাগল। আমাদের যৌবন শেষ হলে আমাদের ভালোবাসাও কি শেষ হয়ে যাবে?

আমি হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি আগের মতো আমাকে ভালোবাসো?”

হ্যাপি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। “এই প্রশ্ন কেন?”

“আমরা দুজনেই বদলে গেছি। তুমি আর আগের মতো সুন্দর নও। আমিও আগের মতো যুবক নই।”

হ্যাপি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “ভালোবাসা কি শুধু চেহারার জন্য?”

“না, কিন্তু…”

“আমি তোমাকে বিয়ে করেছি তোমার সুন্দর চেহারার জন্য নয়। তুমিও আমাকে বিয়ে করেছিলে আমার সৌন্দর্যের জন্য নয়।”

“তাহলে কেন?”

“কারণ তুমি আমার কথা শুনতে। কারণ তুমি আমাকে নিরাপত্তা দিতে। কারণ তুমি আমার সাথে স্বপ্ন দেখতে।”

হ্যাপির কথাগুলো আমার মনে গেঁথে গেল।

“এখনও কি আমি তোমার কথা শুনি?”

“হ্যাঁ।”

“এখনও কি তোমাকে নিরাপত্তা দিই?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমার বুড়ো হওয়ার ভয় কেন?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

হ্যাপি বলল, “আমরা দুজনে যখন আশি বছর বয়সে একসাথে বসব, তখনও আমি তোমাকে ভালোবাসব। কারণ তখনও তুমি আমার মানুষ থাকবে।”

আমি বুঝলাম, বার্ধক্য একটা ভয়ানক জিনিস। কিন্তু একসাথে বুড়ো হওয়া একটা সুন্দর জিনিস।

চেহারা বদলায়। কিন্তু ভালোবাসা বদলায় না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *