দোপুরের রোদে দাঁড়িয়ে দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকালাম। মনে হলো এটা উল্টো দিকে ঘুরছে। সময় এগিয়ে যাওয়ার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাথে সাথে আমার জীবনের সময়ও কমে যাচ্ছে।
এই ঘড়িটা আমার জীবনে কখন থেকে এসেছে জানি না। কিন্তু এটা আমার সব সময় চুরি করে নিচ্ছে। যতক্ষণ এর দিকে তাকাই, ততক্ষণ আমার বয়স বাড়তে থাকে।
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় ঘড়িতে দেখি সাতটা। কিন্তু মনে হয় যেন রাত বারোটা। শরীরে সেই ক্লান্তি, মনে সেই হতাশা।
রাতে বাড়ি ফিরে ঘড়িতে দেখি রাত আটটা। কিন্তু মনে হয় যেন সকাল ছয়টা। আবার নতুন করে দিন শুরু করতে হবে।
এই ঘড়ির কাঁটা যখন এগিয়ে যায়, তখন আমার স্মৃতি পিছিয়ে যায়। যখন পিছিয়ে যায়, তখন আমার ভবিষ্যৎ এগিয়ে যায়।
হ্যাপি বলে, “তুমি বয়স্ক হয়ে যাচ্ছ।” আমি জানি এই ঘড়ি আমার বয়স বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিটা টিক টিক শব্দে আমার যৌবন কমে যাচ্ছে।
আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি কেন সবসময় ঘড়ি দেখেন?” আমি বলতে পারি না যে এই ঘড়ি আমাকে দেখে। আমি যখনই অন্যদিকে তাকাই, এটা আমার সময় চুরি করে।
অফিসে কাজ করার সময় ঘড়ি দেখি। মনে হয় যেন ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেছে। কিন্তু কাজ বেশি এগোয়নি। এই ঘড়ি আমার কর্মক্ষমতাও কেড়ে নিচ্ছে।
রাতে ঘুমানোর আগে ঘড়ি দেখি। কাঁটা বলছে এগারোটা। কিন্তু আমার শরীর বলছে তিনটা। এই ঘড়ি আমার ঘুমও কেড়ে নিয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এই ঘড়ি শুধু আমার সময় নয়, আমার পরিবারের সময়ও কেড়ে নিচ্ছে। হ্যাপির সাথে কথা বলার সময় নেই। আরাশের সাথে খেলার সময় নেই।
আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময়ও ঘড়ি টিক টিক করে। মনে হয় আমার প্রার্থনার সময়ও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এই ঘড়িটা আমি কিনিনি। এটা কোত্থেকে এসেছে জানি না। কিন্তু এটা আমার জীবনে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে এটা ছাড়া আমি সময় বুঝতেই পারি না।
কখনো কখনো ভাবি ঘড়িটা ভেঙে ফেলব। কিন্তু তাহলে কি আমার সময় থেমে যাবে? নাকি আরও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে?
গতকাল আরাশ প্রশ্ন করেছিল, “আব্বু, সময় কেন এত তাড়াতাড়ি যায়?” আমি বলতে পারিনি যে আমাদের ঘড়ি উল্টো দিকে ঘুরছে।
হ্যাপি বলে, “আমাদের সাথে সময় কাটানোর সময় নেই তোমার।” আমি জানি আছে। কিন্তু এই ঘড়ি সেই সময়ও কেড়ে নিয়ে যায়।
রাতে ঘুমের মধ্যেও এই ঘড়ির টিক টিক শুনতে পাই। যেন এটা আমার স্বপ্নের সময়ও মাপছে।
আমার মনে হয় এই ঘড়ি শুধু আমার নয়। এই শহরের সবার জীবনেই এমন একটা ঘড়ি আছে। যেটা সবার সময় কেড়ে নিচ্ছে।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমার সময় ফিরিয়ে দাও।” কিন্তু এই ঘড়ি শুনতে দেয় না সেই প্রার্থনা।
আজ রাতে ঠিক করেছি ঘড়িটার দিকে তাকাব না। দেখি সময় ফিরে আসে কিনা।
কিন্তু জানি আগামীকাল সকালে আবার সেই ঘড়ির দিকেই তাকাতে হবে। কারণ এটা ছাড়া আমি বুঝব না কতটা সময় আর বাকি আছে।
আর এই ভয়েই হয়তো আমার বাকি সময়টুকুও কেটে যাবে।
একটু ভাবনা রেখে যান