আরাশের কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু আরাশ তো এখন এগারো বছরের। কেন কাঁদবে?
বিছানা থেকে উঠে তার ঘরে গিয়ে দেখি সে গভীর ঘুমে। কান্না কোথা থেকে এলো?
তারপর বুঝলাম। এটা সাত বছর আগের কান্না। যখন সে তিন বছরের ছিল। রাতে জ্বর এসেছিল। আমি সারারাত তার পাশে বসেছিলাম।
কিন্তু সেই কান্না আজকের রাতে কেন শুনতে পেলাম?
রান্নাঘরে গিয়ে পানি খেতে গিয়ে দেখি হ্যাপি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এই হ্যাপি আজকের নয়। এ সেই হ্যাপি যার সাথে পনেরো বছর আগে প্রথম দেখা। তখনো বিয়ে হয়নি। চুল ছিল লম্বা। চোখে ছিল অন্যরকম একটা স্বপ্ন।
সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। সেই পুরনো হাসি।
“তুমি এখানে কেন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“আমি তো এখানেই থাকি,” সে বলল।
কিন্তু তার কণ্ঠ পনেরো বছর আগের। আজকের নয়।
বারান্দায় গিয়ে দেখি বাবা বসে আছেন। তিনি তো মারা গেছেন ষোল বছর আগে। কিন্তু এখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন, “তুমি কেমন আছ বাবা?”
আমি বললাম, “বাবা, আপনি তো…”
“আমি তো কী? আমি তো এখানেই আছি।”
তার কণ্ঠ ঠিক সেই রকম যেমন ছিল। কিন্তু তিনি কি অতীত থেকে এসেছেন, নাকি আমি অতীতে চলে গেছি?
হঠাৎ আয়নায় নিজেকে দেখলাম। কিন্তু আয়নার মানুষটা আমার ভবিষ্যত। পঞ্চাশ বছর বয়সী হায়দার। চুল পাকা। মুখে অনেক বলিরেখা।
সে বলল, “এখনো কিছু বুঝতে পারনি?”
আমি বললাম, “কী বুঝব?”
“তুমি কোথায় আছ সেটা বুঝতে পারনি?”
আমি চারদিকে তাকালাম। এ কোন সময়? কোন বছর? কোন মুহূর্ত?
অতীতের আরাশ কাঁদছে। অতীতের হ্যাপি হাসছে। অতীতের বাবা কথা বলছেন। ভবিষ্যতের আমি প্রশ্ন করছে।
আর বর্তমানের আমি দাঁড়িয়ে আছি সবার মাঝখানে।
বুঝলাম, আমি এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছি যেখানে সব সময় একসাথে আসে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – সব একসাথে।
এই কি আমার মানসিক অসুস্থতার চিহ্ন? নাকি এটা একটা উপলব্ধি?
হয়তো আমি এতদিন ভুল করে ভেবেছি যে সময় সরল রেখা। আসলে সময় একটা বৃত্ত। আর আমি সেই বৃত্তের কেন্দ্রে।
অতীতের সব মুহূর্ত, ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনা – সব কিছু আমার চারপাশে ঘুরছে।
কিন্তু এই অভিজ্ঞতা কাউকে বলব কীভাবে? কেউ বিশ্বাস করবে?
আল্লাহ, তুমি কি আমাকে দেখিয়ে দিচ্ছ যে সময় আসলে কী? নাকি আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
জানি না। শুধু জানি, এই রাতে আমি একসাথে ছেলে, স্বামী, বাবা, এবং বৃদ্ধ – সব হয়ে আছি।
আর প্রতিটি রূপের নিজস্ব কষ্ট আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান