ব্লগ

সময়ের দোলাচল

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সময়ের তিন কক্ষ

রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে যায়। ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। অন্ধকারে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় — আমি কোথায় আছি? এই বিছানায়, এই ঘরে, এই শহরে — এটা উত্তর নয়। প্রশ্নটা গভীরতর। আমি কি আছি অতীতে, যেখানে স্মৃতির ছায়ারা ঘুরে বেড়ায়? নাকি ভবিষ্যতে, যেখানে দুশ্চিন্তার কুয়াশা জমে আছে? নাকি এই মুহূর্তে — এই অন্ধকার ঘরে, এই নিঃশ্বাসে, এই হৃদস্পন্দনে?

অতীতের ভুল সংশোধন নাকি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া — এই প্রশ্নটিকে আমরা সাধারণত ব্যবহারিক ভাবি। কী করব, কীভাবে করব। কিন্তু এর তলায় লুকিয়ে আছে অনুশোচনা বনাম আশার অস্তিত্ববাদী সংগ্রাম। এই সংগ্রামে প্রতিফলিত হয় মানুষের সময়চেতনার সবচেয়ে গভীর রহস্য — আমরা কোন সময়ে বাঁচি? কোন সময়ে বাঁচা উচিত? সময় কি একটা সরলরেখা নাকি একটা কারাগার যেখানে আমরা তিনটি কক্ষে বন্দি — গতকাল, আজ, আগামীকাল?

অতীত হচ্ছে নিশ্চয়তার কারাগার। এই কারাগারের দেয়াল ইস্পাতের চেয়ে শক্ত — কারণ যা ঘটে গেছে, তা পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। আমি পনেরো বছর আগে যে কথাটা বলেছিলাম রাগের মাথায়, সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। সেই শব্দগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেছে, কিন্তু তাদের ক্ষত রয়ে গেছে কারো বুকে। আমি বিশ বছর আগে যে সুযোগটা ফেলে দিয়েছিলাম, সেটা আর ফিরে আসবে না। সেই দরজা বন্ধ হয়ে গেছে চিরকালের জন্য। এই অপরিবর্তনীয়তা একটা বিশেষ ধরনের যন্ত্রণা দেয় — জানি ভুল করেছি, জানি ঠিক করতে পারব না, তবু ভাবতে থাকি যদি…

এই ‘যদি’ শব্দটা অতীতের সবচেয়ে বিষাক্ত উপহার। যদি সেদিন অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম! যদি সেই চাকরিটা নিতাম! যদি তাকে বিয়ে করতাম — বা না করতাম! যদি আরো একবার ফোন করতাম বাবাকে, তিনি মারা যাওয়ার আগে! এই ‘যদি’-র তালিকা শেষ হয় না। প্রতিটি ‘যদি’ একটা সমান্তরাল মহাবিশ্ব তৈরি করে মাথার ভেতর — যেখানে আমি সুখী, যেখানে সবকিছু ঠিক আছে, যেখানে ভুলটা হয়নি। এই কাল্পনিক মহাবিশ্বে আমরা এত সময় কাটাই যে বাস্তব মহাবিশ্ব — এই মুহূর্ত, এই জীবন — ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

ভবিষ্যৎ অন্যদিকে অনিশ্চয়তার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা প্রথমে মুক্তির মতো লাগে — সামনে সব খোলা, সব সম্ভব, কিছুই নির্ধারিত নয়। আগামীকাল আমি নতুন মানুষ হতে পারি, নতুন জীবন শুরু করতে পারি, সব বদলে দিতে পারি। এই সম্ভাবনার অসীমতা নেশার মতো — আমরা স্বপ্ন দেখি, পরিকল্পনা করি, আশা করি। কিন্তু এই একই অসীমতা কখনো কখনো পঙ্গু করে দেয়। এত পথ, কোনটায় যাব? এত সম্ভাবনা, কোনটা বেছে নেব? এত অনিশ্চয়তা, কীভাবে এগোব? ভবিষ্যতের স্বাধীনতা হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের উদ্বেগ — কী হবে, কেমন হবে, হবে তো?

মজার বিষয় হলো, অতীত নিয়ে যারা বেশি ভাবে, তারা প্রায়ই ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশি ভাবে। কারণ দুটোই একই মানসিক অভ্যাসের দুই রূপ — বর্তমান থেকে পালানো। অতীতে পালাই অনুশোচনার হাত ধরে, ভবিষ্যতে পালাই উদ্বেগের হাত ধরে। দুই ক্ষেত্রেই আমরা এই মুহূর্ত থেকে সরে যাই — এই শ্বাস, এই হৃদস্পন্দন, এই আলো যা জানালা দিয়ে আসছে।

দুই বন্ধুর গল্প বলি। ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে বড় হওয়া। একজনের নাম ধরি সুমন, আরেকজন রাজু। সুমন সারাজীবন অতীতের একটা ভুল নিয়ে আফসোস করত। বিশ বছর বয়সে একটা ব্যবসার সুযোগ পেয়েছিল — ছোট পুঁজি দিয়ে শুরু করতে পারত, কিন্তু ভয় পেয়ে পিছিয়ে এসেছিল। সেই ব্যবসা পরে বিশাল সফল হলো, যে করেছিল সে কোটিপতি হলো। সুমন প্রতিদিন এই গল্প বলত — “যদি সেদিন সাহস করতাম! যদি পিছিয়ে না আসতাম! আমার জীবন অন্যরকম হতো!” এই ‘যদি’ তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর বয়সেও সে সেই বিশ বছরের সিদ্ধান্তে আটকে রইল।

রাজু ছিল উল্টো। সে সবসময় ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভাসত। “আগামী বছর নতুন ব্যবসা শুরু করব।” “পরের মাসে জিমে যোগ দেব।” “এই প্রজেক্ট শেষ হলে পরিবারকে সময় দেব।” তার জীবন ছিল ‘আগামীকাল’-এর অপেক্ষায়। কিন্তু আগামীকাল কখনো আসত না — কারণ আগামীকাল এলেই সেটা হয়ে যেত আজ, আর সে তখন তাকাত নতুন আগামীকালের দিকে। এভাবে সে বর্তমানে কখনো বাঁচতে পারল না।

সুমন আটকে রইল অতীতে, রাজু হারিয়ে গেল ভবিষ্যতে। দুজনেই মিস করল একটাই জিনিস — এই মুহূর্ত। এই কাপ চা যা এখন হাতে। এই আলো যা এখন জানালায়। এই শ্বাস যা এখন বুকে।

এই গল্পে স্পষ্ট হয় সময়ের বিভ্রম। অতীত আর ভবিষ্যৎ — দুটোই মানসিক নির্মাণ। অতীত হলো স্মৃতি — মস্তিষ্কের কিছু নিউরনের সংযোগ, যা প্রতিবার মনে করার সময় একটু একটু বদলে যায়। ভবিষ্যৎ হলো কল্পনা — মস্তিষ্কের আরেকটু নিউরনের খেলা, যা বাস্তবতার সাথে মিলবে কি না কেউ জানে না। প্রকৃত অস্তিত্ব শুধু বর্তমানে — এই মুহূর্তে, এই সেকেন্ডে। কিন্তু আমরা এই মুহূর্তে বাঁচি কম, স্মৃতি আর স্বপ্নে বাঁচি বেশি।

অনুশোচনার দর্শন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে — অতীতের ভুল স্বীকার করা মানুষত্বের পরিচায়ক। যে কখনো অনুশোচনা করে না, সে হয় মিথ্যাবাদী — নিজের ভুল দেখেও না দেখার ভান করে — অথবা অহংকারী — মনে করে সে ভুল করতে পারে না — অথবা সত্যিই শিখতে অক্ষম। অনুশোচনা হলো আত্মসমালোচনার হাতিয়ার। এটা দিয়ে আমরা নিজেদের কাটাছেঁড়া করি, দেখি কোথায় গলদ ছিল, শিখি কীভাবে ভবিষ্যতে এই গলদ এড়ানো যায়।

কিন্তু অনুশোচনা আর আত্মযন্ত্রণার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেখা আছে। অনুশোচনা হলো শিক্ষা — “আমি ভুল করেছিলাম, আমি শিখেছি, আমি এগিয়ে যাচ্ছি।” আত্মযন্ত্রণা হলো শাস্তি — “আমি ভুল করেছিলাম, আমি খারাপ মানুষ, আমি এই কষ্ট পাওয়ার যোগ্য।” প্রথমটা এগিয়ে নিয়ে যায়, দ্বিতীয়টা আটকে রাখে। কখন শিক্ষা হয়ে ওঠে বিষ? যখন আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে ভুলের জন্য নিজেকে শাস্তি দিতে থাকি — বছরের পর বছর, দশকের পর দশক।

ভবিষ্যৎমুখীতার দর্শনও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে — অতীত শেষ, ভবিষ্যৎ শুরু। গাড়ি চালানোর সময় সামনের কাচ বড়, পেছনের আয়না ছোট — কারণ সামনে যা আছে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগিয়ে চলাই জীবনের মূলমন্ত্র। কিন্তু এই দর্শনেও একটা ফাঁক আছে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে এগিয়ে গেলে কী হয়? একই ভুলের পুনরাবৃত্তি। একই গর্তে বারবার পা দেওয়া। একই মানুষদের বারবার আঘাত করা। ইতিহাস যারা ভোলে, তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয় — এই কথাটা শুধু জাতির জন্য নয়, ব্যক্তির জন্যও সত্য।

তাহলে সমাধান কোথায়? প্রকৃত প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে সময়ের সংশ্লেষণে। তিনটি সময় — অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ — এদের আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে, এবং সেই ভূমিকাগুলো সম্মান করতে হবে। অতীতকে বানাও শিক্ষক — কিন্তু কারাগার নয়। অতীত থেকে শেখো, কিন্তু অতীতে আটকে থেকো না। ভবিষ্যৎকে বানাও অনুপ্রেরণা — কিন্তু পলায়নের পথ নয়। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখো, কিন্তু বর্তমানকে উপেক্ষা করে নয়। আর বর্তমানকে বানাও জীবনের প্রকৃত ক্ষেত্র — কারণ এখানেই তুমি আছ, এখানেই তুমি বাঁচতে পার, এখানেই তুমি কিছু করতে পার।

অতীতের ভুল সংশোধন করা যায় না — এটা কঠিন সত্য, কিন্তু সত্য। সেই কথাটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না, সেই সুযোগ আর ফিরে আসবে না। কিন্তু ক্ষতিপূরণ করা যায়। যাকে আঘাত করেছি, তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া যায়। হয়তো সে ক্ষমা করবে, হয়তো করবে না — কিন্তু চেষ্টাটা আমার হাতে। যে সুযোগ হাতছাড়া করেছি, সেটা ফেরত পাব না — কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নতুন সুযোগ তৈরি করা যায়, নতুন দরজা খোলা যায়।

সক্রিয় ক্ষমার ধারণাটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে ক্ষমা করা মানে ভুলে যাওয়া নয় — মানে দায় স্বীকার করে এগিয়ে যাওয়া। “আমি ভুল করেছিলাম” — এটা স্বীকার করা। “আমি শিখেছি” — এটাও স্বীকার করা। “আমি এখন ভিন্ন মানুষ, এবং আমি এগিয়ে যাচ্ছি” — এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের বোঝা বয়ে বেড়ানো নয়, অতীতের শিক্ষা নিয়ে হাঁটা।

শেষ কথা — সময় একটা নদী। অতীত হচ্ছে সেই জল যা ইতিমধ্যে বয়ে গেছে — তাকে ফিরিয়ে আনার উপায় নেই, সে চলে গেছে সমুদ্রের দিকে। ভবিষ্যৎ হচ্ছে সেই জল যা উৎস থেকে আসছে — তাকে ধরার চেষ্টা বৃথা, সে এখনো পৌঁছায়নি। কিন্তু জীবন হচ্ছে এই মুহূর্তের জল — যা এখন আমার পায়ের নিচে প্রবাহিত, যা আমি ছুঁতে পারছি, অনুভব করতে পারছি। এই প্রবাহে পা ডুবিয়ে রাখা, এই প্রবাহকে অনুভব করা, এই প্রবাহে বাঁচতে শেখা — এটাই হচ্ছে প্রকৃত জীবনের কলা। বাকি সব — স্মৃতি, স্বপ্ন, অনুশোচনা, আশা — এগুলো জীবনের অংশ, কিন্তু জীবন নয়। জীবন এখানে, এই মুহূর্তে, এই শ্বাসে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *