তিন বছর, গ্রীষ্মকাল
মায়ের শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে রাখি। অচেনা লোকজন আমাকে দেখতে চায়। কিন্তু আমি দেখতে চাই না তাদের। মায়ের শরীরের গন্ধ। নিরাপত্তা। পৃথিবী মানে শুধু মা।
সত্তর বছর, শীতকাল
মরার আগে একবার মায়ের কোল পেতে চাই। কিন্তু মা নেই। তার জায়গায় আছে আরাশ। তার কোলে মাথা রাখলে কি সেই একই নিরাপত্তা পাব?
পাঁচ বছর, বর্ষাকাল
উঠোনে কাদা পানি। আমি খালি পায়ে দৌড়াচ্ছি। পিছলে পড়ে যাই। কাঁদি। বাবা এসে তুলে নেন। বলেন, “কিছু হয়নি।” আমি বিশ্বাস করি।
ঊনসত্তর বছর, বর্ষাকাল
আরাশ আমাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরায়। আমি আর হাঁটতে পারি না। সে আমার হাত ধরে। বলে, “কিছু হবে না।” আমি বিশ্বাস করতে চাই।
সাত বছর, শরৎকাল
প্রথম স্কুলের দিন। মায়ের হাত ছাড়তে চাই না। কিন্তু ক্লাসরুমে ঢুকতে হবে। নতুন পৃথিবী। নতুন ভয়।
আটষট্টি বছর, শরৎকাল
অবসর নেওয়ার দিন। অফিস ছাড়তে চাই না। কিন্তু বাড়ি যেতে হবে। নতুন শূন্যতা। নতুন ভয়।
দশ বছর, বসন্তকাল
দাদু মারা গেছেন। আমি বুঝি না মৃত্যু কী। শুধু দেখি সবাই কাঁদছে। আমিও কাঁদি। কারণ সবাই কাঁদছে।
পঁয়ষট্টি বছর, বসন্তকাল
আমার বন্ধু মারা গেল। আমি জানি মৃত্যু কী। কিন্তু এখনো বুঝি না কেন এত কষ্ট হয়। কাঁদি। কারণ আমি একা হয়ে যাচ্ছি।
পনেরো বছর, গ্রীষ্মকাল
প্রথম প্রেম। তার নাম শুধু উচ্চারণ করলেই বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় পুরো পৃথিবী পাল্টে গেছে।
ছাপান্ন বছর, গ্রীষ্মকাল
হ্যাপি রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমার বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ছে।
বাইশ বছর, শীতকাল
চাকরির ইন্টারভিউ। স্যুট পরেছি। নিজেকে বড় মনে হচ্ছে। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
পঞ্চাশ বছর, শীতকাল
অফিসে বসে ভাবি, এই তো আমার জীবন? এই স্যুট, এই চেয়ার, এই ফাইল? ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট।
পঁচিশ বছর, বর্ষাকাল
হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা। মনে হলো তাকে চিরকাল চিনি। মনে হলো জীবন এইমাত্র শুরু।
পঁয়তাল্লিশ বছর, বর্ষাকাল
হ্যাপির দিকে তাকাই। মনে হয় তাকে চিনি না। মনে হয় জীবন কোথায় হারিয়ে গেল।
আটাশ বছর, বসন্তকাল
আরাশ জন্মেছে। তার ছোট্ট হাত আমার আঙুল জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝলাম প্রেম কী।
তেতাল্লিশ বছর, বসন্তকাল
আরাশ বলল, “তুমি কিছু বুঝো না।” আমার হাত ছেড়ে দিল। আমি ভুলে গেলাম প্রেম কী।
তিরিশ বছর, শরৎকাল
বাবা মারা গেলেন। আমি তার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম – আমি তার চেয়ে ভালো বাবা হব।
চল্লিশ বছর, শরৎকাল
আরাশের সাথে ঝগড়া করে আমি বুঝলাম – আমি আমার বাবার মতোই বাবা।
তিন বছর, আবার
মায়ের শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ভাবি – বাইরের পৃথিবীটা কেমন?
সত্তর বছর, শেষবার
আরাশের কোলে মাথা রেখে ভাবি – আমি কি কখনো বুঝতে পেরেছি বাইরের পৃথিবীটা কেমন?
প্রথম স্মৃতি: নিরাপত্তার খোঁজ।
শেষ ইচ্ছে: নিরাপত্তার খোঁজ।
মাঝখানে সত্তর বছর।
মাঝখানে পুরো জীবন।
মাঝখানে কিছুই না।
একটু ভাবনা রেখে যান