ব্লগ

যে কথা শুনে কেউ বোঝে না

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

শোনা আর বোষার ব্যবধান

“আমার মনটা ভারী লাগছে।”

হ্যাপি চা বাড়ছিল। হাত থামল না। কান দিয়ে শুনল, কিন্তু হৃদয় দিয়ে না। বলল, “একটু গরম চা খাও। ভালো লাগবে।”

চা। যেন চা দিয়ে অস্তিত্বের ভার মুছে ফেলা যায়। যেন চায়ের উত্তাপ আত্মার শীতলতা দূর করতে পারে।

আমি চায়ের কথা বলিনি। আমি বলেছিলাম আমার ভেতরে একটা পাথরের মতো কিছু চেপে বসে আছে। একটা অদৃশ্য হাত আমার বুকে ভর দিয়ে আছে। আমি শ্বাস নিতে পারছি, কিন্তু বাঁচছি না।

কিন্তু হ্যাপি শুনল “মন খারাপ”। এবং “মন খারাপ” মানে তার কাছে চা, অথবা ঘুম, অথবা বিনোদন।

সন্ধ্যায় আরাশ পড়তে বসেছিল। আমি তার পাশে বসলাম। বললাম, “তুমি আমার স্বপ্ন।”

সে মাথা তুলল। দেখল আমার দিকে। তারপর বলল, “বাবা, আমি এখন পড়ছি। পরে কথা বলব?”

“তুমি আমার স্বপ্ন” শুনে সে ভাবল আমি তাকে বিরক্ত করছি। বুঝল না আমি বলতে চাইছিলাম এই অন্ধকার জীবনে সে একমাত্র আলো। তার হাসি আমার বেঁচে থাকার কারণ। তার অস্তিত্ব আমার অস্তিত্বের অর্থ।

কিন্তু সে শুনল “বাবার আবেগপ্রবণ মুহূর্ত” আর ভাবল “এখন নয়”।

অফিসে সাহেব প্রজেক্টের কথা বলছিলেন। আমি বললাম, “আমি এই কাজটা ভালোবাসি।”

তিনি হাসলেন। চোখে একটা চকচকে ভাব। বললেন, “খুব ভালো। তাহলে এই মাসে ওভারটাইম করতে পারবে?”

ভালোবাসা। সেই গভীর, প্রায় পবিত্র অনুভূতি। যখন কোনো কাজ করতে গিয়ে সময় উবে যায়, ক্লান্তি মনে হয় না, শুধু একটা পূর্ণতা অনুভব হয়।

কিন্তু তিনি শুনলেন “কর্মতৎপরতা”। আর ভাবলেন এই ভালোবাসা কিনে নেওয়া যায়। ওভারটাইমের টাকা দিয়ে।

রাতে জামিউলকে ফোন করলাম। বন্ধু। দশ বছরের বন্ধু। বললাম, “আমি মাঝে মাঝে হারিয়ে যেতে চাই।”

সে উৎসাহী কণ্ঠে বলল, “দারুণ আইডিয়া! ছুটি নিয়ে কক্সবাজার ঘুরে আসো। আমিও যাব।”

হারিয়ে যাওয়া। সেই চূড়ান্ত মুক্তি। যখন আমার কোনো পরিচয় থাকবে না, কোনো দায়িত্ব থাকবে না, কোনো প্রত্যাশা থাকবে না। যখন আমি শুধু থাকব না।

কিন্তু সে শুনল “ভ্রমণের ইচ্ছা”। ভাবল সমুদ্র দেখলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই কি আমার নিয়তি? বলা আর বোঝানোর মধ্যে চিরকাল একটা অতল খাদ থেকে যাবে?

মানুষ আমার শব্দ শোনে। কিন্তু আমার নীরবতা শোনে না। শব্দের মাঝের শূন্যতা, বিরামচিহ্নের ভার, চোখের ভাষা—এসব তারা দেখে না।

আমি যখন বলি “কষ্ট”, তারা শোনে “অসুবিধা”। যেন ট্যাবলেট খেলে সেরে যাবে।

আমি যখন বলি “একাকী”, তারা শোনে “একটু বিরক্ত”। যেন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে কেটে যাবে।

আমি যখন বলি “খোঁজ”, তারা শোনে “অভাব”। যেন কিছু কিনলে পূর্ণ হবে।

ছোটবেলায় একবার আম্মুকে বলেছিলাম, “আমি ভয় পাই।”

রাত ছিল। ঝড় হচ্ছিল বাইরে। কিন্তু আমার ভয় ঝড়ের নয়। আমার ভয় ছিল জীবনের। এই বিশাল, অজানা, অনিশ্চিত জীবনের।

আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “ভূত-টূত কিছু নেই। ভয় পেও না।”

ভূত। আম্মু ভাবলেন আমি অন্ধকারে ভূত দেখছি। বুঝলেন না আমি ভবিষ্যতের অমানিশা দেখছি।

এখন বুঝি মানুষ শুধু সেটাই শোনে যেটা তারা শুনতে প্রস্তুত। আমরা সবাই নিজের নিজের ফিল্টার দিয়ে অন্যের কথা শুনি। আমার “কষ্ট” তোমার কানে পৌঁছায় তোমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ছেঁকে। আর তোমার জীবনে “কষ্ট” মানে হয়তো মাথাব্যথা বা অর্থ সংকট।

তাই আমার অস্তিত্বগত যন্ত্রণা তুমি শোনো “একটু মন খারাপ” হিসেবে।

অফিসের লিফটে একদিন একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখলাম। বললাম নিজেকে, “আমি কষ্টে আছি।”

আয়নার মানুষটাও আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু সেও বুঝল না। কারণ সে শুধু আমার প্রতিফলন, আমার সত্তা নয়।

একবার হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি কি আমার কথা বোঝো?”

সে বলেছিল, “অবশ্যই। আমরা তো দশ বছর একসাথে।”

কিন্তু সময় দিয়ে কি বোঝাপড়া মাপা যায়? দশ বছর পাশাপাশি শুয়ে থাকলেই কি একে অপরের স্বপ্ন দেখা যায়?

আমি চাই কেউ আমার অসম্পূর্ণ বাক্য শেষ করে দিক। আমি “আমি…” বলব আর সে বুঝবে বাকিটা। আমি চুপ করে থাকব আর সে বুঝবে কেন চুপ।

কিন্তু এমন মানুষ কি আছে?

মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে বললাম, “আমার মন শান্তি পাচ্ছে না।”

তিনি বললেন, “বেশি বেশি নামাজ পড়ো। কোরআন তেলাওয়াত করো।”

নামাজ পড়ি। কোরআন পড়ি। কিন্তু এই অশান্তি আমলের ঘাটতি নয়। এই অশান্তি অস্তিত্বের। আমি আছি, কিন্তু কেউ আমার “আছি”-টা অনুভব করছে না।

একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছা হলো। জোরে চিৎকার। যাতে পুরো শহর শুনতে পায়। কিন্তু চিৎকার করলেও কি তারা বুঝবে?

তারা শুনবে একটা শব্দ। একটা গোলমাল। কেউ ভাববে পাগল, কেউ ভাববে মাতাল, কেউ ভাববে মানসিক রোগী।

কিন্তু কেউ বুঝবে না এই চিৎকার একটা আত্মার আর্তনাদ।

হয়তো ভাষাই সমস্যা। শব্দ দিয়ে অনুভূতি ধরা যায় না। যেমন ছবি দিয়ে গান ধরা যায় না। একটা মাধ্যম দিয়ে আরেকটা মাধ্যমের সত্যি প্রকাশ হয় না।

আমি যখন বলি “ভালোবাসি”, শব্দটা বাতাসে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু আমার বুকের ভেতর যে আগুন, সেটা তো ছড়ায় না। সেটা থেকে যায় ভেতরে, জ্বলতে থাকে একা।

আমি যখন বলি “কষ্ট”, শব্দটা কানে পৌঁছায়। কিন্তু আমার হৃদয়ের যে ক্ষত, সেটা তো দেখা যায় না। সেটা লুকিয়ে থাকে অন্ধকারে, রক্তপাত করে নীরবে।

মাঝরাতে নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে বলি, “ইয়া আল্লাহ, তুমি কি আমার কথা বোঝো?”

তারপর নিজেই হাসি। আল্লাহ সবকিছু জানেন। তাঁকে বলতে হয় না। তিনি শুনেন সেই ভাষা যা মুখে আসে না। তিনি পড়েন সেই লেখা যা কাগজে লেখা হয় না।

হয়তো এটাই সান্ত্বনা। পৃথিবীতে কেউ না বুঝলেও, আল্লাহ বোঝেন।

কিন্তু মানুষের কাছে এই বোঝাপড়া চাই কেন? কারণ আমি মানুষ। আমি একা বাঁচতে পারি না। আমার দরকার কেউ যে আমার দিকে তাকাবে আর বুঝবে। শব্দ ছাড়াই বুঝবে।

হ্যাপি রান্নাঘরে কাজ করছে। আমি ড্রয়িংরুমে বসে আছি। দুটো ঘরের ব্যবধান। কিন্তু মনে হয় দুটো গ্রহের দূরত্ব।

আরাশ তার ঘরে খেলছে। হাসছে। কিন্তু তার হাসির সাথে আমার হাসির কোনো সংযোগ নেই। সে তার জগতে, আমি আমার জগতে।

আমরা একই বাড়িতে থাকি, কিন্তু আলাদা দ্বীপে বাস করি।

কখনো কখনো মনে হয় বোঝাপড়া একটা মিথ্যা ধারণা। মানুষ কখনো মানুষকে সম্পূর্ণ বোঝে না। আমরা শুধু ভাবি বুঝি। আমরা অনুমান করি, কল্পনা করি, ব্যাখ্যা করি। কিন্তু প্রকৃত বোঝাপড়া কখনো হয় না।

কারণ প্রত্যেকের ভেতরে একটা গোপন কক্ষ আছে যেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। সেই কক্ষে আমরা একা। চিরকাল একা।

তবুও আমরা চেষ্টা করি। বলতে চেষ্টা করি। বোঝাতে চেষ্টা করি। কারণ চেষ্টাটাই হয়তো ভালোবাসা।

জানি তুমি বুঝবে না, তবুও বলি। জানি আমার কথা তোমার কানে পৌঁছাবে ভিন্ন অর্থে, তবুও বলি। কারণ না বললে তো আরো দূরে সরে যাব।

হয়তো যোগাযোগ মানে সম্পূর্ণ বোঝাপড়া নয়। যোগাযোগ মানে শুধু চেষ্টা। পৌঁছানোর চেষ্টা। ছোঁয়ার চেষ্টা। সংযোগের চেষ্টা।

আর এই চেষ্টার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার অর্থ।

তাই পরের দিন সকালে আবার হ্যাপিকে বলব, “আমার মনটা ভারী লাগছে।”

সে হয়তো আবার বলবে, “চা খাও।”

কিন্তু আমি বলব। কারণ বলাটাই আমার প্রতিরোধ। নীরবতার বিরুদ্ধে। একাকীত্বের বিরুদ্ধে। বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে।

আর হয়তো একদিন, কোনো এক অলৌকিক মুহূর্তে, কেউ সত্যিই বুঝবে। শব্দের অর্থ নয়, শব্দের আড়ালের অর্থ।

সেই আশায় বলে যাই। বলে যাই।

কারণ চুপ করে থাকা মানে হারিয়ে যাওয়া। আর আমি এখনো হারাতে প্রস্তুত নই।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *