আজ পদোন্নতির চিঠি এসেছে। ডেপুটি ম্যানেজার। বেতন ত্রিশ হাজার বেড়েছে। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমি হাসছি। কিন্তু ভিতরে একটা কালো গর্ত।
এই পদোন্নতির পেছনে একটা ফাইল আছে। সেই ফাইলে একটা সিগনেচার আছে। আমার। একটা প্রোজেক্টের অ্যাপ্রুভাল। যেটা ভুল। কিন্তু সই করেছি। কারণ বস বলেছে।
ছয় মাস আগের কথা। রশিদ নামের একটা ভেন্ডর। তার কোম্পানির কোয়ালিটি খারাপ। কিন্তু সে বসের বন্ধু। বস বলল, “তার ফাইল পাস করে দাও।” আমি বললাম, “কিন্তু স্যার, কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড…” বস চোখ পাকাল। “তুমি কি পদোন্নতি চাও না?”
সেই রাতে ঘুম আসেনি। বারবার ভেবেছি—সই করব নাকি করব না? সকালে গিয়ে সই করলাম। নিজেকে বোঝালাম—এটা ছোট ব্যাপার। সবাই করে।
কিন্তু সেই প্রোজেক্ট ব্যর্থ হলো। রশিদের সাপ্লাই দেরি হলো। কোয়ালিটি খারাপ। কোম্পানির লস ত্রিশ লাখ টাকা। কিন্তু আমার পদোন্নতি এল।
আমি কি এই ত্রিশ লাখের দায় নিয়ে উঠতে পারব?
অফিসে নতুন কেবিনটা দেখছি। কাচের দেওয়াল। বড় টেবিল। এসি ঠান্ডা। কিন্তু আমার গায়ে ঠান্ডা লাগছে ভিন্ন কারণে।
জুনিয়রদের দিকে তাকাই। তারা আমাকে “স্যার” বলে ডাকে। সম্মান করে। কিন্তু আমি কি সম্মানের যোগ্য? নাকি আমি একটা প্রতারক যে ভালো অভিনয় জানে?
আমার নতুন দায়িত্ব হচ্ছে আরো ফাইল অ্যাপ্রুভ করা। আরো সিগনেচার। কিন্তু প্রতিটা সিগনেচারের আগে ভাবতে হবে—এটা সঠিক নাকি ভুল? আর যদি ভুল হয়, তাহলে আরো পদোন্নতির জন্য কি আবার ভুলটা সই করব?
একটা চক্র তৈরি হয়েছে। পদোন্নতি পেতে নৈতিকতা বিক্রি করেছি। এখন পজিশন ধরে রাখতে আরো বিক্রি করতে হবে।
রাতে বাড়ি ফিরি। নতুন ইনক্রিমেন্টের টাকা। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কী কিনব? আরাম? সুখ? নাকি আরো অস্বস্তি?
বন্ধু জামিলকে বলেছিলাম এই দ্বিধার কথা। সে বলল, “দোস্ত, সবাই করে। তুমি অযথা চিন্তা করছো।” কিন্তু সবাই করলেই কি সেটা ঠিক হয়ে যায়?
আমার ভিতরে দুটো মানুষ লড়াই করছে। একজন বলছে—”তুমি সফল হয়েছো। পরিবারের জন্য ভালো কিছু করতে পারছো।” আরেকজন বলছে—”তুমি নিজেকে বিক্রি করেছো। এই সাফল্য ভুয়া।”
কোনটা সত্য?
পদোন্নতির সার্টিফিকেট দেওয়ালে টাঙাব? নাকি ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখব? কারণ এই কাগজটা আমার অহংকারের নাকি লজ্জার?
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে—আমি এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। এখন নৈতিকতার প্রশ্ন মাথায় আসে কম। আসে সুবিধার প্রশ্ন।
আমি কি একটা দুর্নীতিবাজ হয়ে গেছি? নাকি সিস্টেমটাই এমন যে এখানে বেঁচে থাকতে হলে নৈতিকতা বিসর্জন দিতে হয়?
পদোন্নতি পেয়েছি, কিন্তু নিজেকে হারিয়েছি।
এই সোনার মেডেল কি আসলে একটা সোনালি শিকল?
একটু ভাবনা রেখে যান