ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখি। আমাদের এলাকার বিখ্যাত হুজুর সাহেবের নতুন বাড়ি। তিনতলা, সামনে দুটো গাড়ি। ক্যাপশনে লেখা – “আল্লাহর ওলির বরকতময় বাড়ি।” কমেন্টে মানুষ লিখেছে – “মাশাল্লাহ, হুজুর সাহেবের রিজিকে বরকত।”
আমি মনে মনে হিসাব করি। এই বাড়ির দাম অন্তত ২ করোড় টাকা। আমার পুরো জীবনের রোজগার দিয়েও এর এক চতুর্থাংশ হবে না।
হ্যাপি পাশে এসে বলে, “কার বাড়ি দেখছো?” আমি স্ক্রিন দেখিয়ে বলি, “হুজুর সাহেবের নতুন বাড়ি।” হ্যাপি বলে, “বাহ, খুব সুন্দর।” তারপর যোগ করে, “কিন্তু আমাদের ভাড়া বাড়ির মালিক গতকালই বলে গেছেন পরের মাসের ভাড়া বাড়বে।”
আমার পেটে যেন কিছু একটা নড়ে ওঠে।
আমি ইউটিউবে হুজুর সাহেবের ওয়াজ দেখি। তিনি বলছেন, “দুনিয়ার প্রতি লোভ করবেন না। সম্পদের পেছনে ছোটাছুটি করবেন না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন।” ভিডিওর শেষে দেখি তিনি একটা মার্সিডিস গাড়িতে করে চলে যাচ্ছেন।
আমি কমেন্ট পড়ি। একজন লিখেছে, “হুজুর সাহেব সম্পদের লোভ না করতে বলেন, কিন্তু নিজে করোড়পতি।” এই কমেন্টের জবাবে অন্য কেউ লিখেছে, “হুজুর সাহেব আল্লাহর ওলি। আল্লাহ তাকে দিয়েছেন।”
আমি ভাবি – আল্লাহ কি শুধু হুজুরদের দেন? আমার মতো সাধারণ মানুষদের দেন না কেন?
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আজ স্কুলে শিক্ষক বলেছেন আমাদের স্কুলের ফি বাড়বে। কারণ তাদের বেতন বাড়াতে হবে।” আমি জিজ্ঞেস করি, “কত বাড়বে?” সে বলে, “মাসিক ৫০০ টাকা।”
আমার মাথায় হাত দিয়ে বসি। ৫০০ টাকা মানে আমার ১৫ দিনের খাবার খরচ।
সন্ধ্যায় মসজিদে গিয়েছি। ইমাম সাহেব বলছেন, “আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন।” আমি ভাবি – তিনি কি জানেন আমি আগামী মাসের ভাড়া কোথা থেকে দেব?
নামাজের পর ইমাম সাহেব ঘোষণা দেন, “মসজিদের জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছে। মিনিমাম এক হাজার টাকা।” আমার পকেটে আছে ২০০ টাকা। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখি।
বাড়ি ফিরে ফেসবুক খুলি। দেখি হুজুর সাহেবের ছেলের বিয়ের ছবি। পাঁচতারকা হোটেলে রিসেপশন। হাজার খানেক লোকের দাওয়াত। আমি ক্যালকুলেটর বের করি। এই একটা অনুষ্ঠানের খরচ কমপক্ষে ৫০ লক্ষ টাকা।
আমি মনে করি – এই ৫০ লক্ষ টাকা দিয়ে কত দরিদ্র মেয়ের বিয়ে দেয়া যেত? কত এতিমের পড়ালেখার খরচ চালানো যেত?
হ্যাপি এসে বলে, “কী দেখছো?” আমি স্ক্রিন দেখিয়ে বলি। সে বলে, “ওরা তো বড়লোক। ওদের সামর্থ্য আছে।” আমি বলি, “কিন্তু এই টাকা আসে কোথা থেকে? সাধারণ মানুষের দানের টাকা থেকে না?”
হ্যাপি চুপ হয়ে যায়।
আমি একটা হিসাব করি। আমাদের এলাকার ১০০টা পরিবার যদি মাসে গড়ে ৫০০ টাকা করে দান করে, তাহলে বছরে ৬ লক্ষ টাকা হয়। হুজুর সাহেবের একটা গাড়ির দামই ৫০ লক্ষ টাকা।
আমার মাথা ঘুরতে থাকে।
রাতে আরাশ বলে, “আব্বু, আজ তাহমিদ বলেছে হুজুর সাহেব নাকি আল্লাহর বিশেষ প্রিয়। তাই আল্লাহ তাকে বিশেষ নিয়ামত দিয়েছেন।” আমি জিজ্ঞেস করি, “তুমি কী বলেছো?” আরাশ বলে, “আমি বলেছি তাহলে আমরা কি আল্লাহর অপ্রিয়? তাই আমাদের এত কষ্ট?”
আমার গলায় কান্না চেপে আসে।
আমি কোরআন খুলে পড়ি। দেখি আল্লাহ বলেছেন – “যারা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে তাদের পেটে আগুন ঢুকে।” আমি ভাবি – হুজুর সাহেবরা কি এই আয়াত পড়েন না?
আমি আরো পড়ি। নবীজি (সা:) এর জীবনী। দেখি তিনি কত সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। কাপড়ে তালি, সরল খাবার। তার বিছানা ছিল খেজুর পাতার। কিন্তু আজকের ধর্মীয় নেতারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়েন।
আমি প্রশ্ন করি নিজেকে – ধর্মীয় নেতৃত্ব কি রাজত্বের লাইসেন্স হয়ে গেছে?
আমি স্বপ্ন দেখি। নবীজি (সা:) এসে জিজ্ঞেস করছেন, “তোমাদের আলেমরা কেমন?” আমি কী বলবো? বলব তারা প্রাসাদে থাকেন? বলব তারা করোড় টাকার গাড়ি চালান?
আমি স্বপ্নে কান্নায় ভেঙে পড়ি।
সকালে ঘুম ভাঙে। আয়নায় নিজের মুখ দেখি। ভাবি – আমি কি ভুল পথে? নাকি আমাদের ধর্মীয় নেতারা ভুল পথে?
আমার মনে হয় আমি একটা উল্টানো পিরামিডের নিচে আছি। যারা দান নেন তারা প্রাসাদে, যারা দান দেন তারা ভাড়া বাড়িতে।
একটু ভাবনা রেখে যান