ব্লগ

সংযোগহীন পৃথিবীর শেষ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“No Internet Connection” – এই লেখাটা দেখতেই আমার মনে হল যেন পৃথিবীর সাথে আমার সব সংযোগ কেটে গেছে। যেন আমি একটা মহাকাশযানে একা ভেসে আছি, আর পৃথিবীর সাথে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আমার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল। বুকে একটা চাপ অনুভব করলাম। এটা কী হল? ইন্টারনেট নেই মানে কী? আমি কি বেঁচে থাকতে পারব?

হ্যাপি দেখে বলল, “কী হয়েছে তোর? এমন ভূতের মতো মুখ করে রেখেছ কেন?” আমি বলতে পারলাম না যে এই মুহূর্তে আমি অনুভব করছি যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।

প্রথমেই যেটা মনে এল – অফিসের জরুরি ইমেইল চেক করতে পারব না। ক্লায়েন্টরা যদি কিছু পাঠায়? প্রোজেক্ট আপডেট যদি আসে? আমি কিভাবে জানব?

আরাশ বলল, “বাবা, কার্টুন দেখব।” আমি বললাম, “নেট নাই।” আরাশ হতাশ হয়ে গেল। তারপর বই নিয়ে বসে গেল। আমি দেখলাম ওর সাথে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার?

আমি ভাবলাম – এখন যদি কোনো জরুরি খবর হয়? দেশে কোনো বড় ঘটনা? পৃথিবীতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু? আমি কিছুই জানতে পারব না।

রাউটার দেখলাম। সব লাইট বন্ধ। যেন একটা মৃত যন্ত্র। আমি রিস্টার্ট দিলাম। দুই মিনিট অপেক্ষা। আবার একই অবস্থা। আমার মাথায় ঘাম।

মনে পড়ল বাবার কথা। উনি বলতেন, “হায়দার, মানুষের আসল শক্তি নিজের ভিতরে। বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করিস না।” কিন্তু আমি দেখছি আমার সব শক্তি যেন এই অদৃশ্য ইন্টারনেট কানেকশনের উপর নির্ভরশীল।

ফোনের হটস্পট চেক করলাম। ডাটা প্যাক শেষ। আমি বুঝলাম আমি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এই অনুভূতি কেমন? যেন আমি একটা দ্বীপে আটকা পড়েছি।

হঠাৎ মনে হল – এই যে এত উদ্বেগ, এত অস্থিরতা, এটা কি স্বাভাবিক? ১৫ বছর আগে তো ইন্টারনেট ছিল না। তখন কি আমরা বেঁচে ছিলাম না?

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে গান গাইছে। আরাশ বই পড়ছে। বাইরে পাখি ডাকছে। বাতাস বইছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে পৃথিবী স্থির হয়ে গেছে।

আমি বুঝলাম, আমার কাছে ইন্টারনেট শুধু একটা সুবিধা না। এটা একটা নেশা। একটা অভ্যাস। একটা মানসিক নির্ভরশীলতা। এটা ছাড়া আমি নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করি।

জানালা দিয়ে দেখলাম রাস্তায় মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করছে। তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে জরুরি অবস্থা।

চেষ্টা করলাম বই নিয়ে বসতে। কিন্তু মন বসছে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা মিস করছি। কোথায় কী হচ্ছে জানতে পারছি না।

আমার ভাবনাটা হঠাৎ অন্যদিকে গেল – আমি কি ইন্টারনেট ব্যবহার করি, নাকি ইন্টারনেট আমাকে ব্যবহার করে? এই মুহূর্তে ইন্টারনেট না থাকাতে আমি যে অস্থিরতা অনুভব করছি, এটা কি একটা মানসিক রোগের লক্ষণ?

দুই ঘন্টা পর হঠাৎ ফোনে নোটিফিকেশন এল। ইন্টারনেট ফিরে এসেছে। আমার ভিতরে যেন জীবন ফিরে এল। অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসার মতো অনুভূতি।

কিন্তু এই দুই ঘন্টায় আমি কী করেছি? কোনো বই পড়িনি, কোনো কাজ করিনি, পরিবারের সাথে গল্প করিনি। শুধু ইন্টারনেটের জন্য অপেক্ষা করেছি।

রাতে শুয়ে ভাবলাম – আমি কি এমন একটা যুগে বাস করছি যেখানে ইন্টারনেট কানেকশনের উপর আমার মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে? যেখানে অনলাইনে না থাকলে আমি অস্তিত্ব সংকটে পড়ি?

এই নির্ভরশীলতা কি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে? নাকি এটাই আধুনিক জীবনের বাস্তবতা?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *