ব্লগ

চায়ের কাপে সংসারের অঙ্কশাস্ত্র

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি যখন চা এনে দিল, আমি কাপটা হাতে নিয়ে ভাবলাম—এই গরম তরলের ভিতরে কত হিসাব লুকিয়ে আছে। দুধ কত টাকা, চিনি কত টাকা, চা পাতা কত টাকা। একটা চায়ের কাপেও সংসারের পুরো অঙ্কশাস্ত্র।

আমি আগে চা খেতাম না। এখন দিনে তিনবার চাই। কিন্তু এই ‘চাওয়া’র একটা দাম আছে। আরাশ সকালে বিস্কুট চায়, হ্যাপি ভাজা পরোটা বানায়। এসব ছোট খুশির পেছনে কত টাকা যায়, সেটা ভাবলে মাথা ঘুরে ওঠে।

গত মাসে বিজলি বিল দিতে গিয়ে দেখলাম আট দিন পর দিতে হবে। তখন হিসাব করে দেখি, আমরা প্রতিদিন চা-নাশতায় যা খরচ করি, তা দিয়ে মাসে একটা বিল দেওয়া যায়। সেদিন রাতে আরাশের কাছে বসে ভাবলাম—আমি কি তাকে সেই নিরাপত্তা দিতে পারছি যা একজন বাবার দেওয়া উচিত?

তারপর থেকে আমরা নিয়ম করেছি। দিনে দুই কাপ চা, বেশি না। বাইরের চা নয়, ঘরের চা। নাশতায় মুড়ি-চিড়া, দামি বিস্কুট নয়। আরাশ প্রথমে মন খারাপ করেছিল। বললাম, ‘এভাবে তোর সাইকেলের জন্য টাকা জমবে।’ শুনে খুশি হয়ে গেল।

হ্যাপি কিছু বলে না। কখনো জোর করে না। কিন্তু মাঝে মাঝে তার চোখে দেখি এক ধরনের প্রশ্ন। আমি তার সেই নীরবতায় নিজের ব্যর্থতা পড়তে পারি। সে জানে আমাদের অবস্থা, কিন্তু কষ্ট দেয় না।

বারান্দায় বসে মানুষদের দেখি। সবার হাতে চায়ের কাপ। কেউ দৌড়ে যাচ্ছে অফিসে, কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মনে হয় আমরা সবাই কোনো না কোনো হিসাবের ভিতর দিয়ে বেঁচে আছি। কেউ হিসাব করে খরচ করছে, কেউ করছে না। কিন্তু হিসাবটা থেকেই যাচ্ছে।

এখন মাসে প্রায় হাজার টাকা বাঁচে আমাদের। হাজার টাকা মানে আরাশের নতুন বই, হ্যাপির ওষুধ, আমার লেখার কাগজ। কিন্তু এই বাঁচানোর মধ্যেও একটা ক্ষুধা থেকে যায়। শুধু চায়ের ক্ষুধা নয়—স্বাভাবিক জীবনের ক্ষুধা।

মাঝে মাঝে মনে হয়, চায়ের এই হিসাব জীবনের বড় হিসাবের মতো। আমি কি ঠিক পথে আছি নাকি ভুল? আমার এই সংযমের মধ্যে কি পরিবারের জন্য ভালোবাসা, নাকি শুধু অসহায়তা?

আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমাদের এই ছোট ত্যাগে যেন বরকত থাকে। যেন হ্যাপি-আরাশের জন্য যা করছি, সেটা সঠিক হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত তো টাকার চেয়ে বড় হিসাব হলো—আমি কি আমার পরিবারের কাছে যথেষ্ট?

চায়ের কাপ শেষ করে রাখি। কাপের তলায় চিনির সামান্য গুঁড়ো পড়ে আছে। মনে হয়, এই গুঁড়োর মতোই আমাদের স্বপ্নগুলো—একদম শেষে, একদম তলায়। কিন্তু আছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *