ব্লগ

স্বপ্নে দেখা জীবন বাস্তবের চেয়ে সত্য মনে হওয়া

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

স্বপ্ন

একটি কাল্পনিক গল্প


শুক্রবার দুপুরে ঘুম ভেঙে ইকবাল সাহেব বুঝতে পারলেন না তিনি কোথায় আছেন।

এই ছোট ঘর? এই ভাঙা পাখা? এই ফাটা দেয়াল?

এগুলো তাঁর নয়।

তাঁর তো বড় বাড়ি। এসি ঘর। সাদা দেয়াল।

তারপর মনে পড়লো — সেটা স্বপ্ন ছিল।


কিন্তু স্বপ্নটা এত বাস্তব ছিল।

সেখানে তিনি একটা বড় কোম্পানির ম্যানেজার। প্রতিদিন গাড়িতে করে অফিসে যান। কেবিনে বসেন। মানুষ সম্মান করে।

স্ত্রী শাহানা সেখানে সুখী। তাঁর মুখে সবসময় হাসি। কোনো চিন্তা নেই। কোনো অভাব নেই।

ছেলে জুবায়ের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। ইউনিফর্ম পরে যায়। গাড়ি তাকে স্কুলে নামিয়ে দেয়।

সবকিছু ঠিকঠাক।

সেই জীবন তাঁর।

তাহলে এই জীবন কার?


ইকবাল সাহেব উঠে বসলেন।

ঘরে তাকালেন।

একটা খাট। একটা আলমারি। একটা টেবিল। দেয়ালে ক্যালেন্ডার।

এই ঘরে তিনি পনেরো বছর ধরে আছেন।

কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এই ঘর চেনেন না।

এই ঘর তাঁর নয়।


শাহানা ঘরে ঢুকলেন।

“উঠেছ? চা দিই?”

ইকবাল সাহেব শাহানার দিকে তাকালেন।

স্বপ্নের শাহানা এমন ছিল না। স্বপ্নের শাহানার মুখে ক্লান্তি ছিল না। চুলে পাক ধরেনি। চোখের নিচে কালি ছিল না।

এই শাহানা… এই শাহানা কে?

“কী হয়েছে? এমন করে তাকাচ্ছ কেন?”

“কিছু না।”


চা খেতে বসলেন।

জুবায়ের পড়ছে। টেবিলে বই খুলে।

ইকবাল সাহেব দেখলেন — বইয়ের পাতা হলুদ হয়ে গেছে। পুরনো বই।

স্বপ্নের জুবায়েরের বই নতুন ছিল। চকচকে। রঙিন।

এই জুবায়ের…

“বাবা, কী দেখছ?”

“কিছু না।”


সন্ধ্যায় বাইরে গেলেন।

গলির মুখে দাঁড়ালেন।

সামনে একটা ছোট চায়ের দোকান। পাশে একটা মুদি দোকান। রাস্তায় কাদা।

স্বপ্নে তাঁর বাড়ির সামনে পাকা রাস্তা ছিল। গাছ ছিল। ল্যাম্পপোস্ট ছিল।

এই গলি তাঁর নয়।

এই জীবন তাঁর নয়।


সেই রাতে আবার ঘুমালেন।

আবার সেই স্বপ্ন।

বড় বাড়ি। সকালে ঘুম ভাঙলে পাশে শাহানা — হাসিমুখে। “চা খাবে?”

“খাব।”

ডাইনিং টেবিলে বসলেন। কাজের মেয়ে নাস্তা দিলো। টোস্ট, ডিম, জুস।

জুবায়ের নেমে এলো। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা।

“বাবা, আজ আমাদের ম্যাচ আছে। আসবে?”

“আসব।”

গাড়িতে উঠলেন। ড্রাইভার গাড়ি চালালো। অফিসে পৌঁছালেন।

রিসেপশনিস্ট বললো, “গুড মর্নিং স্যার।”

“গুড মর্নিং।”

কেবিনে বসলেন। কফি এলো। ফাইল এলো। মানুষ এলো পরামর্শ নিতে।

এই জীবন।

এই জীবন তাঁর।


ঘুম ভাঙলো।

আবার সেই ছোট ঘর। সেই ভাঙা পাখা। সেই ফাটা দেয়াল।

ইকবাল সাহেবের চোখে পানি এলো।

কেন এই ঘরে ফিরে আসতে হয়?

কেন সেই জীবনে থাকতে পারেন না?


দিনে দিনে এই সমস্যা বাড়তে লাগলো।

জাগ্রত অবস্থায় তিনি থাকতে চান না। শুধু ঘুমাতে চান।

কারণ ঘুমের মধ্যেই তাঁর আসল জীবন।

শাহানা বললেন, “তুমি এত ঘুমাও কেন?”

“ক্লান্ত।”

“সারাদিন তো কিছু করো না। ক্লান্ত কীসের?”

ইকবাল সাহেব উত্তর দিলেন না।

কীভাবে বোঝাবেন? বলবেন যে তিনি অন্য একটা জীবনে যেতে চান? যেখানে শাহানা সুখী? যেখানে জুবায়েরের অভাব নেই?

পাগল ভাববে।


একদিন জুবায়ের জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি কি আমাদের সাথে থাকতে চাও না?”

“কেন বলছিস?”

“তুমি সবসময় ঘুমাও। আমাদের সাথে কথা বলো না।”

ইকবাল সাহেবের বুক কেঁপে উঠলো।

তিনি কি এতটাই দূরে চলে গেছেন?

“থাকতে চাই, বাবা।”

“তাহলে?”

“তোমাদের জন্যই তো…”

তিনি থামলেন।

তোমাদের জন্যই তো স্বপ্ন দেখি। যেখানে তোমরা সুখী।

কিন্তু বললেন না।


সেই রাতে স্বপ্নে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো।

স্বপ্নের জীবনে তিনি অফিসে বসে আছেন। হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

দেখলেন — একজন মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

সেই মানুষ… সেই মানুষ তিনি নিজে।

জাগ্রত জীবনের ইকবাল সাহেব।

ক্লান্ত চেহারা। পুরনো জামা। হতাশ চোখ।

স্বপ্নের ইকবাল সাহেব জানালা থেকে সরে গেলেন।

কিন্তু সেই চেহারা মাথা থেকে গেল না।


ঘুম ভাঙলো।

ইকবাল সাহেব বুঝলেন — দুটো জীবন আলাদা নয়।

দুটোই তাঁর।

একটায় তিনি সফল। আরেকটায় ব্যর্থ।

একটায় সুখী। আরেকটায় দুঃখী।

কিন্তু দুটোই সত্য।


শাহানাকে বললেন, “আমি একটা স্বপ্ন দেখি।”

“কী স্বপ্ন?”

“আমরা সুখী। তোমার মুখে হাসি। জুবায়েরের কোনো অভাব নেই।”

শাহানা চুপ করে রইলেন।

“সেই স্বপ্নে থাকতে ইচ্ছা করে।”

শাহানা বললেন, “আমিও স্বপ্ন দেখি।”

“কী?”

“একই রকম। আমরা সুখী। তুমি চিন্তামুক্ত।”

ইকবাল সাহেব অবাক হলেন।

“তুমিও?”

“সবাই দেখে। যাদের অভাব আছে, তারা সবাই সুখের স্বপ্ন দেখে।”


সেই রাতে অনেকক্ষণ কথা হলো।

শাহানা বললেন, “স্বপ্নে পালিয়ে গিয়ে কী হবে? জেগে তো এখানেই ফিরতে হয়।”

“তাহলে কী করব?”

“এখানেই কিছু করো। যাতে এই জীবনটাও একটু সুন্দর হয়।”

“কীভাবে?”

“জানি না। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকলে তো হবে না।”


পরদিন ইকবাল সাহেব একটা কাজ করলেন।

বহুদিন পর সকালে তাড়াতাড়ি উঠলেন।

জুবায়েরকে নিয়ে বাইরে গেলেন। পার্কে।

জুবায়ের খুশি হলো। “বাবা, আজ কেন?”

“এমনি।”

দুজনে হাঁটলেন। কথা বললেন। হাসলেন।

ইকবাল সাহেব বুঝলেন — এই মুহূর্তটা স্বপ্নের চেয়ে কম সুন্দর নয়।


সন্ধ্যায় শাহানার জন্য ফুল আনলেন।

রাস্তার পাশ থেকে। দাম বেশি না।

শাহানা অবাক হলেন। “এটা কী?”

“ফুল।”

“জানি ফুল। কিন্তু কেন?”

“এমনি।”

শাহানা হাসলেন।

সেই হাসি… সেই হাসি স্বপ্নের শাহানার হাসির মতো।

ইকবাল সাহেব বুঝলেন — হাসি টাকায় কেনা যায় না।


সেই রাতে আবার স্বপ্ন দেখলেন।

কিন্তু এবার স্বপ্নটা আলাদা।

তিনি স্বপ্নের বড় বাড়িতে বসে আছেন। কিন্তু একা। শাহানা নেই। জুবায়ের নেই।

বিশাল ঘর। কিন্তু শূন্য।

তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

দেখলেন — ছোট একটা ঘরে শাহানা আর জুবায়ের বসে আছে। হাসছে। কথা বলছে।

সেই ঘর তাঁর জাগ্রত জীবনের ঘর।

ইকবাল সাহেব বুঝলেন — বড় বাড়িতে একা থাকার চেয়ে ছোট ঘরে একসাথে থাকা ভালো।


ঘুম ভাঙলো।

পাশে শাহানা ঘুমাচ্ছেন। পাশের ঘরে জুবায়ের।

ছোট ঘর। পুরনো আসবাব। ফাটা দেয়াল।

কিন্তু পরিবার আছে।

এটাও তো একটা সম্পদ।


ইকবাল সাহেব এখনো স্বপ্ন দেখেন।

কিন্তু এখন জানেন — স্বপ্ন স্বপ্নই। বাস্তব বাস্তবই।

স্বপ্নে পালিয়ে গিয়ে কিছু হয় না।

বাস্তবকে একটু একটু সুন্দর করতে হয়।

একটা ফুল। একটা হাসি। একটা সকালের হাঁটা।

এগুলো দিয়েই জীবন বদলায়।

বড় বাড়ি না থাকলেও চলে।

ছোট ঘরেও সুখ সম্ভব।


আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ইকবাল সাহেব জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

ছোট গলি। কাদা রাস্তা। মুদি দোকানের আলো।

এটাই তাঁর জীবন।

এটাই সত্য।

স্বপ্ন সুন্দর।

কিন্তু জেগে থাকাটাও মন্দ না।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *