ব্লগ

স্বপ্নের দোকান বন্ধ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

পুরনো ডায়েরি খুলে দেখি একটা স্বপ্নের তালিকা। কুড়ি বছর আগের। “৩৫ বছর বয়সে নিজের রেস্তোরাঁ খুলব। ৪০ বছর বয়সে ইউরোপ ভ্রমণ। ৪৫ বছর বয়সে একটা বই লিখব।”

এখন আমার উনচল্লিশ। কোনোটাই করতে পারিনি।

স্বপ্নগুলো ড্রয়ারে তালা দিয়ে রেখেছি। চাবি হারিয়ে গেছে অর্থনৈতিক চাপের কোলাহলে।

রেস্তোরাঁর স্বপ্ন? সেই টাকা দিয়ে আরাশের স্কুলের ভর্তি ফি দিতে হয়েছে। ইউরোপ ভ্রমণ? সেই টাকা দিয়ে বাড়ির ছাদ মেরামত করতে হয়েছে। বই লেখা? সময়টা পার্ট টাইম কাজে দিতে হয়েছে।

প্রতিবার বলি—”পরের বছর। যখন একটু স্থিতিশীল হব।” কিন্তু স্থিতিশীলতা আসে না। আসে নতুন চাপ। নতুন দায়িত্ব। নতুন প্রয়োজন।

মাঝে মাঝে ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসাব করি। বর্তমান বেতনে স্বপ্ন পূরণ করতে কত বছর লাগবে? উত্তর দেখে হাসি আসে। বিশ বছর। তখন আমার উনষাট। স্বপ্ন দেখার বয়স শেষ।

বন্ধু জামিউল বলে, “দোস্ত, স্বপ্ন ছাড়া জীবন কী?” আমি বলি, “স্বপ্ন দেখার জন্য পেট ভর্তি থাকতে হয়।” সে নীরব হয়ে যায়।

সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন দেখি অন্যরা আমার স্বপ্ন পূরণ করছে। কলিগ রাজিবের রেস্তোরাঁ খুলেছে। ইনস্টাগ্রামে ছবি দেখি। ঈর্ষা হয়। কিন্তু রাজিবের বাবার টাকা আছে। আমার নেই।

আরাশ একদিন বলল, “বাবা, আপনি তো বলতেন রান্নার দোকান দেবেন।” উত্তর খুঁজে পাই না। কী বলব? বাবার স্বপ্ন পকেটে টাকা থাকলেই পূরণ হয়?

অর্থনৈতিক চাপ শুধু টাকার সমস্যা নয়। মানসিক সমস্যাও। প্রতিদিন ভাবতে হয়—এই টাকা খরচ করা ঠিক হবে? এই স্বপ্ন দেখা বাস্তবসম্মত?

ধীরে ধীরে স্বপ্ন দেখাই বন্ধ করে দিয়েছি। যেহেতু পূরণ হবে না, দেখে লাভ কী?

কিন্তু স্বপ্নহীন জীবন কি জীবন? নাকি শুধু টিকে থাকা?

মাঝে মাঝে রাতে ভাবি—আমি কি ভুল অগ্রাধিকার দিয়েছি? পরিবারের দায়িত্বের নামে নিজের স্বপ্ন মেরে ফেলেছি?

কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব পালন না করলে কি শান্তিতে স্বপ্ন দেখতে পারতাম?

হয়তো সমস্যা ব্যালেন্সে। স্বপ্ন আর দায়িত্বের মাঝে। কিন্তু সেই ব্যালেন্স কীভাবে?

ছোট ছোট স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি। বড় রেস্তোরাঁর বদলে বাড়িতে ক্যাটারিং। ইউরোপের বদলে কক্সবাজার। বই লেখার বদলে ব্লগ।

কিন্তু ছোট স্বপ্নও টাকার দরকার। সময়ের দরকার। সাহসের দরকার।

মাঝে মাঝে ভাবি—স্বপ্ন স্থগিত রাখা আর স্বপ্ন মেরে ফেলা কি একই কথা?

হয়তো স্বপ্নের নতুন সংজ্ঞা দিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বপ্নকে রূপ দিতে হবে।

অথবা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আজীবন অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু জীবন কি অপেক্ষায় কাটানোর জন্য?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *