ব্লগ

নিলামখানায় আমার স্বপ্নের দর

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্রথম ডাক: সকাল নয়টা

“আজকের নিলামে প্রথম আইটেম – একটি স্বপ্ন। একজন চুয়াল্লিশ বছর বয়সী পুরুষের। লেখক হওয়ার স্বপ্ন। প্রাথমিক দর – মাসিক পনেরো হাজার টাকা।”

আমি দর্শকের আসনে বসে আছি। মঞ্চে আমারই স্বপ্নটা নিলামে উঠেছে। নিলামদার আমার দিকেই তাকিয়ে।

একজন ক্রেতার কণ্ঠ, পিছন থেকে: “পনেরো হাজার? এই দামে তো কবিতা লেখা বন্ধ করানো যায়।”

আমার অচেতনের প্রতিবাদ: “কিন্তু আমি তো কবি নই। আমি… আমি কী?”

দ্বিতীয় ডাক: দুপুর একটা

নিলামদার আবার ডাকছে। “দ্বিতীয় আইটেম – একজন মানুষের মর্যাদাবোধ। বিশ বছরের পুরানো। সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু ব্যবহারযোগ্য। প্রাথমিক দর – মাসিক বিশ হাজার।”

এবার মঞ্চে আমার বিবেক। একটা কাচের পাত্রে। একটু ঘোলা। আলো ভেদ করতে পারছে না পুরোপুরি।

একজন এইচআর ম্যানেজারের কণ্ঠ: “বিশ হাজারে নিলাম। এই দামে তো দুর্নীতিতে অংশ নেওয়ানো যায়।”

আমার স্মৃতি থেকে বাবার কণ্ঠ, ১৯৯৮: “বেটা, যে দামেই হোক, নিজের ইজ্জত বিক্রি করবি না।”

আমার বর্তমান সত্তার উত্তর: “কিন্তু বাবা, আজকাল ইজ্জতের দাম কত?”

তৃতীয় ডাক: সন্ধ্যা ছয়টা

“তৃতীয় আইটেম – একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। একটি স্ত্রী ও একটি ছেলের স্বপ্ন। ওজন – অমূল্য। কিন্তু আজকের বাজারে দর – মাসিক পঁচিশ হাজার।”

মঞ্চে হ্যাপি আর আরাশ। তারা আমার দিকে তাকিয়ে। চোখে প্রশ্ন – “তুমি আমাদের বিক্রি করবে?”

আমার ভালোবাসার কণ্ঠ: “আমি তোমাদের বিক্রি করি না। আমি আমার সময় বিক্রি করি।”

সময়ের কণ্ঠ: “কিন্তু তোমার সময় তো তোমার জীবন। তোমার জীবন তো তোমার ভালোবাসা।”

চতুর্থ ডাক: রাত দশটা

নিলামদার ক্লান্ত। “শেষ আইটেম – একটি আত্মা। প্রায় নতুনের মতো। সামান্য ব্যবহৃত। মালিক নিজেই বিক্রি করতে চান। প্রাথমিক দর – মাসিক ত্রিশ হাজার।”

আমি উঠে দাঁড়াই। মঞ্চে যাই। আমার আত্মাটা হাতে নিই।

নিলামদারের প্রশ্ন: “আপনি নিশ্চিত? এটা ফেরত পাওয়া কঠিন।”

আমার উত্তর: “আমার বিকল্প কী? আমার তো টাকা লাগে।”

নিলামের মধ্যবর্তী সময়: হিসাবনিকাশ

আমি একটা খাতা খুলি। লিখতে শুরু করি:

ডেবিট সাইড (যা হারিয়েছি):

ক্রেডিট সাইড (যা পেয়েছি):

ব্যালেন্স: ৪৫,০০০ লাভ বনাম ৯০,০০০ ক্ষতি = ৪৫,০০০ টাকার ঘাটতি

পঞ্চম ডাক: মধ্যরাত

হঠাৎ আরেকটা নিলাম শুরু হয়। উল্টো নিলাম।

“আজকের বিপরীত নিলামে প্রথম আইটেম – একটি চাকরি। নয় থেকে পাঁচটা। সপ্তাহে ছয় দিন। মানসিক চাপ সহ। কেউ কিনবেন?”

আমার প্রশ্ন: “বিপরীত নিলাম মানে?”

নিলামদার: “এখানে আপনি টাকা দিয়ে আপনার স্বাধীনতা কিনবেন।”

আমার বিকল্প নিলাম

আমি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করি:

“আমি একটি বিকল্প নিলামের আয়োজন করছি। এখানে যা বিক্রি হবে:

একজন ক্রেতার আপত্তি: “কিন্তু এগুলোর তো বাজার দর নেই।”

আমার উত্তর: “বাজার দর নেই মানেই অমূল্য।”

ষষ্ঠ ডাক: ভোরের আলো

নিলামদার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সে আমার অন্তর্দৃষ্টি।

“ফাইনাল নিলাম। একটি প্রশ্ন বিক্রি হবে: ‘আমি কি আমার জীবন বিক্রি করছি, নাকি কিনছি?'”

মার্ক্সের কণ্ঠ, পুঁজির গভীর থেকে: “শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে, নিজেকে নয়।”

আমার প্রত্যুত্তর: “কিন্তু শ্রমশক্তি আর আত্মা আলাদা কীভাবে?”

সার্ত্রের কণ্ঠ: “মানুষ নিজেকে বিক্রি করতে পারে না। কারণ মানুষ নিজেই একটি প্রকল্প।”

সমাপনী নিলাম: আমার নিজের দর

আমি আমার নিজের নিলামদার।

“আজকের শেষ আইটেম – হায়দার নামের একটি মানুষ। চুয়াল্লিশ বছর বয়সী। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্পূর্ণ কার্যক্ষম। প্রশ্ন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, ভালোবাসতে পারে।

প্রাথমিক দর?”

আমার নিজের ডাক: “অবিক্রেয়।”

নিলামদার: “কেন?”

আমার চূড়ান্ত ঘোষণা: “কারণ আমি পণ্য নই। আমি মানুষ। আমার দর দেওয়া হয় না। আমার মূল্য আছে।”

হিসাবের শেষ পাতা

নিলামখানা ফাঁকা। শুধু আমি। আমার হাতে একটা নতুন খাতা।

আমি লিখি:

প্রকৃত সম্পদের তালিকা:

মোট সম্পদ: অনন্ত

এবং এই লাইনটি যুগের পর যুগ উদ্ধৃত হবে:

“আমি আমার স্বপ্নের দর জানি না। কিন্তু জানি – যার দর আছে, সে স্বপ্ন নয়, সে পণ্য।”

নিলামখানা থেকে বের হয়ে আসি। বাইরে সূর্যোদয়। আমার পকেটে বেতনের চেক। আমার হৃদয়ে অবিক্রীত স্বপ্ন।

আজ অফিসে গিয়ে বলব – “আমি আমার সময় ভাড়া দিচ্ছি। আমার আত্মা নয়।”

এই হিসাব রাখব প্রতিদিন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *