প্রথম ডাক: সকাল নয়টা
“আজকের নিলামে প্রথম আইটেম – একটি স্বপ্ন। একজন চুয়াল্লিশ বছর বয়সী পুরুষের। লেখক হওয়ার স্বপ্ন। প্রাথমিক দর – মাসিক পনেরো হাজার টাকা।”
আমি দর্শকের আসনে বসে আছি। মঞ্চে আমারই স্বপ্নটা নিলামে উঠেছে। নিলামদার আমার দিকেই তাকিয়ে।
একজন ক্রেতার কণ্ঠ, পিছন থেকে: “পনেরো হাজার? এই দামে তো কবিতা লেখা বন্ধ করানো যায়।”
আমার অচেতনের প্রতিবাদ: “কিন্তু আমি তো কবি নই। আমি… আমি কী?”
দ্বিতীয় ডাক: দুপুর একটা
নিলামদার আবার ডাকছে। “দ্বিতীয় আইটেম – একজন মানুষের মর্যাদাবোধ। বিশ বছরের পুরানো। সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু ব্যবহারযোগ্য। প্রাথমিক দর – মাসিক বিশ হাজার।”
এবার মঞ্চে আমার বিবেক। একটা কাচের পাত্রে। একটু ঘোলা। আলো ভেদ করতে পারছে না পুরোপুরি।
একজন এইচআর ম্যানেজারের কণ্ঠ: “বিশ হাজারে নিলাম। এই দামে তো দুর্নীতিতে অংশ নেওয়ানো যায়।”
আমার স্মৃতি থেকে বাবার কণ্ঠ, ১৯৯৮: “বেটা, যে দামেই হোক, নিজের ইজ্জত বিক্রি করবি না।”
আমার বর্তমান সত্তার উত্তর: “কিন্তু বাবা, আজকাল ইজ্জতের দাম কত?”
তৃতীয় ডাক: সন্ধ্যা ছয়টা
“তৃতীয় আইটেম – একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। একটি স্ত্রী ও একটি ছেলের স্বপ্ন। ওজন – অমূল্য। কিন্তু আজকের বাজারে দর – মাসিক পঁচিশ হাজার।”
মঞ্চে হ্যাপি আর আরাশ। তারা আমার দিকে তাকিয়ে। চোখে প্রশ্ন – “তুমি আমাদের বিক্রি করবে?”
আমার ভালোবাসার কণ্ঠ: “আমি তোমাদের বিক্রি করি না। আমি আমার সময় বিক্রি করি।”
সময়ের কণ্ঠ: “কিন্তু তোমার সময় তো তোমার জীবন। তোমার জীবন তো তোমার ভালোবাসা।”
চতুর্থ ডাক: রাত দশটা
নিলামদার ক্লান্ত। “শেষ আইটেম – একটি আত্মা। প্রায় নতুনের মতো। সামান্য ব্যবহৃত। মালিক নিজেই বিক্রি করতে চান। প্রাথমিক দর – মাসিক ত্রিশ হাজার।”
আমি উঠে দাঁড়াই। মঞ্চে যাই। আমার আত্মাটা হাতে নিই।
নিলামদারের প্রশ্ন: “আপনি নিশ্চিত? এটা ফেরত পাওয়া কঠিন।”
আমার উত্তর: “আমার বিকল্প কী? আমার তো টাকা লাগে।”
নিলামের মধ্যবর্তী সময়: হিসাবনিকাশ
আমি একটা খাতা খুলি। লিখতে শুরু করি:
ডেবিট সাইড (যা হারিয়েছি):
- স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা: ১৫,০০০
- মর্যাদাবোধ: ২০,০০০
- পারিবারিক সময়: ২৫,০০০
- আত্মার স্বাধীনতা: ৩০,০০০ মোট হারানো: ৯০,০০০ টাকা
ক্রেডিট সাইড (যা পেয়েছি):
- মাসিক বেতন: ৩০,০০০
- সামাজিক নিরাপত্তা: ১০,০০০
- চাকরির মর্যাদা: ৫,০০০ মোট পাওয়া: ৪৫,০০০ টাকা
ব্যালেন্স: ৪৫,০০০ লাভ বনাম ৯০,০০০ ক্ষতি = ৪৫,০০০ টাকার ঘাটতি
পঞ্চম ডাক: মধ্যরাত
হঠাৎ আরেকটা নিলাম শুরু হয়। উল্টো নিলাম।
“আজকের বিপরীত নিলামে প্রথম আইটেম – একটি চাকরি। নয় থেকে পাঁচটা। সপ্তাহে ছয় দিন। মানসিক চাপ সহ। কেউ কিনবেন?”
আমার প্রশ্ন: “বিপরীত নিলাম মানে?”
নিলামদার: “এখানে আপনি টাকা দিয়ে আপনার স্বাধীনতা কিনবেন।”
আমার বিকল্প নিলাম
আমি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করি:
“আমি একটি বিকল্প নিলামের আয়োজন করছি। এখানে যা বিক্রি হবে:
- সততা (অবিক্রেয়)
- ভালোবাসা (অবিক্রেয়)
- স্বপ্ন (নতুন সংস্করণ, প্রতিদিন তৈরি)
- আত্মসম্মান (নন-ট্রেডেবল)
- সময় (শুধু ভাড়ায় দেওয়া, বিক্রি নয়)”
একজন ক্রেতার আপত্তি: “কিন্তু এগুলোর তো বাজার দর নেই।”
আমার উত্তর: “বাজার দর নেই মানেই অমূল্য।”
ষষ্ঠ ডাক: ভোরের আলো
নিলামদার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সে আমার অন্তর্দৃষ্টি।
“ফাইনাল নিলাম। একটি প্রশ্ন বিক্রি হবে: ‘আমি কি আমার জীবন বিক্রি করছি, নাকি কিনছি?'”
মার্ক্সের কণ্ঠ, পুঁজির গভীর থেকে: “শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে, নিজেকে নয়।”
আমার প্রত্যুত্তর: “কিন্তু শ্রমশক্তি আর আত্মা আলাদা কীভাবে?”
সার্ত্রের কণ্ঠ: “মানুষ নিজেকে বিক্রি করতে পারে না। কারণ মানুষ নিজেই একটি প্রকল্প।”
সমাপনী নিলাম: আমার নিজের দর
আমি আমার নিজের নিলামদার।
“আজকের শেষ আইটেম – হায়দার নামের একটি মানুষ। চুয়াল্লিশ বছর বয়সী। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্পূর্ণ কার্যক্ষম। প্রশ্ন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, ভালোবাসতে পারে।
প্রাথমিক দর?”
আমার নিজের ডাক: “অবিক্রেয়।”
নিলামদার: “কেন?”
আমার চূড়ান্ত ঘোষণা: “কারণ আমি পণ্য নই। আমি মানুষ। আমার দর দেওয়া হয় না। আমার মূল্য আছে।”
হিসাবের শেষ পাতা
নিলামখানা ফাঁকা। শুধু আমি। আমার হাতে একটা নতুন খাতা।
আমি লিখি:
প্রকৃত সম্পদের তালিকা:
- হ্যাপির হাসি: অমূল্য
- আরাশের কৌতূহল: অমূল্য
- রাতের নামাজ: অমূল্য
- প্রশ্ন করার সাহস: অমূল্য
- না বলার শক্তি: অমূল্য
মোট সম্পদ: অনন্ত
এবং এই লাইনটি যুগের পর যুগ উদ্ধৃত হবে:
“আমি আমার স্বপ্নের দর জানি না। কিন্তু জানি – যার দর আছে, সে স্বপ্ন নয়, সে পণ্য।”
নিলামখানা থেকে বের হয়ে আসি। বাইরে সূর্যোদয়। আমার পকেটে বেতনের চেক। আমার হৃদয়ে অবিক্রীত স্বপ্ন।
আজ অফিসে গিয়ে বলব – “আমি আমার সময় ভাড়া দিচ্ছি। আমার আত্মা নয়।”
এই হিসাব রাখব প্রতিদিন।
একটু ভাবনা রেখে যান