রবিবার সকালে হ্যাপি আর আরাশের সাথে ছাদে বসে চা খাচ্ছিলাম। ঢাকার কোলাহল দূরে, পাখির ডাকে ভোর হচ্ছে। আরাশ তার খেলনা নিয়ে ব্যস্ত, হ্যাপি আমার পাশে বসে আছে নিরবে। এই মুহূর্তটা পারফেক্ট। কিন্তু আমার মন অন্যত্র – ভাবছি যে প্রমোশনটা এখনো হয়নি, যে বাড়িটা কিনতে চাই, যে বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা আছে। এই সুন্দর বর্তমানে বসেও আমি ভবিষ্যতের অধূরা স্বপ্নে হারিয়ে আছি।
স্বপ্ন কি আমার বন্ধু, নাকি শত্রু?
জামিউর গতকাল বলছিল, “ভাই, আমার স্বপ্ন ছিল একটা বড় দোকান। এখন হয়েছে, কিন্তু মন ভরে না। এখন চাই গাড়ি।” তার কথা শুনে ভাবলাম – স্বপ্ন কি একটা অতৃপ্ত দানব? এক স্বপ্ন পূরণ হলে সে আরেকটা স্বপ্ন হাজির করে?
অফিসে আমার সহকর্মী নাজমুল বলল, “দেখ, আমি এই চাকরি পেয়ে কত খুশি ছিলাম। এখন মনে হয় এটা যথেষ্ট নয়।” আমি নিজের দিকে তাকালাম – আমিও তো এমনই। যখন এই চাকরি পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এটাই সব। এখন এই চাকরি আমার কাছে “যথেষ্ট নয়” মনে হয়।
সাইফুল কবির একদিন বলেছিল, “ভাই, আমার বাবা সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছেন, কিছুই পূরণ হয়নি। আমি তার ভুল করব না।” কিন্তু সাইফুলও তো স্বপ্ন দেখে। শুধু ভিন্ন স্বপ্ন। তাহলে কি স্বপ্ন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব?
আরাশকে যখন দেখি তার খেলনা নিয়ে এত মজে আছে, মনে হয় সে আমার চেয়ে বেশি সুখী। সে ভবিষ্যতের চিন্তায় নেই, অতীতের আফসোসে নেই। এই মুহূর্তে যা আছে তাই নিয়েই খুশি। আমি কখন এই ক্ষমতা হারিয়েছি?
মৃদুল যখন দেশে ছিল, স্বপ্ন দেখত বিদেশে যাওয়ার। “সেখানে গেলে জীবন সেট হয়ে যাবে।” এখন কানাডায় গিয়ে বলে, “ভাই, এখানে এসে বুঝেছি সুখ জায়গার উপর নির্ভর করে না।” কিন্তু মৃদুল এখন স্বপ্ন দেখে দেশে ফিরে আসার।
হ্যাপির মা যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, আমি স্বপ্ন দেখতাম তিনি সুস্থ হবেন। সেই সময় আমার কোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। শুধু চাইতাম তিনি ভালো থাকুন। সেই সরল চাওয়াটা কত শান্তিদায়ক ছিল। এখন আবার জটিল স্বপ্নে ফিরে গেছি।
আমার মনে হয়, স্বপ্ন একটা দোতলা। এটা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু একই সাথে বর্তমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। স্বপ্ন আমাদের বলে, “যা আছে তা যথেষ্ট নয়।” আর সন্তুষ্টি বলে, “যা আছে তাই যথেষ্ট।”
কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া কি জীবন থেমে যায়? আমি যদি এই চাকরিতেই সন্তুষ্ট থাকি, কোনো উন্নতির চেষ্টা না করি, তাহলে কি আমি স্থবির হয়ে যাব? আরাশের জন্য কি ভালো উদাহরণ হব?
হয়তো সমস্যা স্বপ্নে নয়, স্বপ্নের ধরনে। আমার স্বপ্নগুলো কি আমার নিজের, নাকি সমাজের দেওয়া? “বড় বাড়ি চাই,” “গাড়ি চাই,” “প্রমোশন চাই” – এগুলো কি আমার হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, নাকি সামাজিক প্রত্যাশা?
দেয়া বোনের বিয়ের দিন যখন আমরা সবাই একসাথে বসেছিলাম, সেই মুহূর্তে আমার কোনো স্বপ্নের কথা মনে ছিল না। শুধু অনুভব করেছিলাম যে এই পরিবারটা, এই মানুষগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেটা কি স্বপ্ন ছিল, নাকি বাস্তবতা?
আমার বড় ভাই যখন আলাদা হয়ে গেল, আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম সে ফিরে আসবে। কিন্তু যখন মেনে নিলাম যে সে আর ফিরবে না, তখন আমি বর্তমানের পরিবার নিয়ে বেশি খুশি থাকতে শিখলাম।
হয়তো স্বপ্ন আর সন্তুষ্টি দুটোরই জায়গা আছে। কিন্তু ভারসাম্য দরকার। স্বপ্ন যেন বর্তমানকে অবহেলা করার অজুহাত না হয়। আর সন্তুষ্টি যেন অগ্রগতি থেমে দেওয়ার অজুহাত না হয়।
আমার স্বপ্ন হলো আরাশ ভালো মানুষ হবে। এই স্বপ্ন আমাকে তার সাথে আজকে ভালো সময় কাটাতে অনুপ্রাণিত করে। আমার সন্তুষ্টি হলো আজকের এই চা খাওয়া, এই কথোপকথন। এই দুটো একে অপরের বিপরীত নয়।
হ্যাপির সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে আমার স্বপ্ন আছে – আরো গভীর বোঝাপড়া, আরো ভালোবাসা। কিন্তু আমি যা পেয়েছি তাও কম নয়। একজন সঙ্গী যে আমার পাশে থাকে, যে আমাকে বোঝে। এই কৃতজ্ঞতা আমার স্বপ্নকে আরো সুন্দর করে তোলে।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমার আসল সমস্যা হয়তো ভুল স্বপ্ন দেখা। আমি স্বপ্ন দেখি বস্তুর, অবস্থানের, স্বীকৃতির। কিন্তু আমার স্বপ্ন দেখা উচিত অভিজ্ঞতার, সম্পর্কের, বৃদ্ধির।
আমি স্বপ্ন দেখি যে আমি একদিন সফল হব। কিন্তু হয়তো আমার স্বপ্ন হওয়া উচিত যে আমি প্রতিদিন অর্থবহ কাজ করব। আমি স্বপ্ন দেখি যে আমার সবকিছু থাকবে। কিন্তু হয়তো আমার স্বপ্ন হওয়া উচিত যে আমি যা আছে তা নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকব।
রবিবারের সেই ছাদের মুহূর্তে ফিরে যাই। হ্যাপি আর আরাশের সাথে চা খাওয়া। এটা কি আমার স্বপ্ন, নাকি আমার বাস্তবতা? হয়তো এই প্রশ্নটাই ভুল। হয়তো সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন হলো বর্তমানকে পূর্ণভাবে বাঁচা।
আর হয়তো সবচেয়ে গভীর সন্তুষ্টি হলো স্বপ্ন দেখার ক্ষমতায় কৃতজ্ঞ থাকা।
একটু ভাবনা রেখে যান