ব্লগ

শরীরের জাগরণ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত সপ্তাহে জামিউর বলল, “হায়দার, চল জিমে যাই।” আমি বললাম, “আমার কী দরকার জিমের?” “শরীর ঠিক রাখতে হবে। মন খারাপ থাকলে শরীরও খারাপ হয়ে যায়।”

প্রথমে রাজি হইনি। টাকার অভাব। আর জিমে গিয়ে কী করবো? কিন্তু জামিউর জেদ করল। “প্রথম মাস আমি দিয়ে দেবো। তারপর দেখো কেমন লাগে।”

গতকাল প্রথমদিন গেলাম। ভয় ভয় লাগছিল। জিমে সবাই কত সুন্দর শরীর। আর আমি? চিকন, দুর্বল। কিন্তু ট্রেনার ভাই বলল, “সবাই এভাবেই শুরু করে।”

প্রথমে ট্রেডমিলে হাঁটলাম। ধীরে ধীরে। পাঁচ মিনিটেই হাঁপিয়ে গেলাম। আমি ভাবলাম—আমার শরীর কত দুর্বল হয়ে গেছে। কবে থেকে শরীরের কথা ভাবিনি। শুধু মনের চিন্তা।

কিন্তু দশ মিনিট হাঁটার পর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। যেন শরীরের ভেতর কিছু একটা জেগে উঠছে। রক্ত দ্রুত চলছে। হৃদয় জোরে স্পন্দিত হচ্ছে।

ট্রেনার বলল, “এবার ডাম্বেল তুলুন।” আমি বললাম, “আমি পারবো?” “পারবেন। হালকা দিয়ে শুরু করুন।” দুই কেজির ডাম্বেল হাতে নিলাম।

প্রথম তোলার সময় মনে হল—এতই সহজ? কিন্তু দশবার তোলার পর হাত কাঁপতে লাগল। বুঝলাম—সহজ নয়। কিন্তু অসম্ভবও নয়।

ডাম্বেল তুলতে তুলতে অদ্ভুত লাগছিল। আমি নিজের শরীরের সাথে লড়াই করছি। নিজের সীমানা পার হওয়ার চেষ্টা করছি। এই লড়াইয়ে একটা আনন্দ আছে।

বিশ মিনিট এক্সারসাইজ করার পর ঘেমে গেলাম। কিন্তু এই ঘাম অন্যরকম। এতে কোনো অস্বস্তি নেই। বরং একটা স্বস্তি। যেন শরীর থেকে সব খারাপ জিনিস বেরিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেনার বলল, “কেমন লাগছে?” আমি বললাম, “অদ্ভুত। মনে হচ্ছে আমি জীবিত।” সে হেসে বলল, “ঠিক বলেছেন। এক্সারসাইজ শরীরকে জাগিয়ে তোলে।”

আমি ভাবলাম—এই “জাগিয়ে তোলা” মানে কী? আমি তো আগেও জেগে ছিলাম। কিন্তু হয়তো শুধু মানসিকভাবে। শারীরিকভাবে ঘুমিয়ে ছিলাম।

জিম থেকে বেরিয়ে বাসায় ফেরার পথে মনে হল—আমি অন্য মানুষ হয়ে গেছি। আমার হাঁটার ভঙ্গি আলাদা। কাঁধ সোজা। মাথা উঁচু। আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

হ্যাপি বলল, “তোমাকে আলাদা লাগছে।” আমি বললাম, “কেমন আলাদা?” “চেহারায় একটা উজ্জ্বলতা।” “সত্যি?” “হ্যাঁ। কী করেছো?”

আমি বললাম, “শরীরের সাথে বন্ধুত্ব করেছি।” হ্যাপি হেসে বলল, “মানে?” “বছরের পর বছর শরীরকে অবহেলা করেছি। আজ তার যত্ন নিয়েছি।”

আরাশ এসে বলল, “বাবা, তুমি আজ আলাদা লাগছো।” “কেন?” “তোমার গলার আওয়াজ জোরালো।” আমি বুঝলাম—সত্যিই। আমার কণ্ঠস্বর ভারী হয়েছে। আত্মবিশ্বাসী হয়েছে।

রাতে শুয়ে ভাবলাম—এই যে আমি জিমে এক্সারসাইজ করলাম, এর প্রভাব শুধু শরীরে নয়। মনেও। মনে হচ্ছে—আমি যেকোনো কিছু করতে পারবো।

কিন্তু এটা কেন? শুধু কিছু ডাম্বেল তোলা আর ট্রেডমিলে হাঁটার কারণে এত পরিবর্তন?

হয়তো কারণ আমি নিজের সীমানা পার হয়েছি। যেটা আমার সাধ্যের বাইরে মনে হয়েছিল, সেটা করেছি। আর এই বিজয় আমাকে শক্তি দিয়েছে।

আমার মনে হল—জিম শুধু শরীর গড়ার জায়গা নয়। এটা আত্মবিশ্বাস গড়ার জায়গা। এখানে আমি নিজের সাথে লড়াই করি। নিজেকে জিতাই।

আজ সকালে উঠে দেখি—গায়ে ব্যথা। কিন্তু এই ব্যথা ভালো লাগছে। এতে যন্ত্রণা নেই, আছে গর্ব। এটা আমার শরীরের পুনর্জাগরণের ব্যথা।

হ্যাপি বলল, “ব্যথা করছে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। কিন্তু ভালো ব্যথা।” “ভালো ব্যথা মানে?” “যে ব্যথা বলে—তুমি কিছু একটা করেছো।”

আমি স্থির করেছি—প্রতিদিন জিমে যাবো। এটা আমার জন্য শুধু এক্সারসাইজ নয়। এটা আমার জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। আমার আত্ম-সম্মান পুনরুদ্ধার।

জামিউর ফোন করে বলল, “কেমন লাগল?” আমি বললাম, “অসাধারণ। তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছো।” “এত দ্রুত?” “হ্যাঁ। আমি আবিষ্কার করেছি—আমার একটা শরীর আছে।”

আমি সত্যিই আবিষ্কার করেছি। বছরের পর বছর আমি ভেবেছি—আমি শুধু একটা মন। কিন্তু আমার একটা শরীরও আছে। যেটা যত্ন চায়। যেটা শক্তিশালী হতে চায়।

আর এই শরীর যখন শক্তিশালী হয়, তখন মনও শক্তিশালী হয়।

এটাই হয়তো জিমের আসল জাদু।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *