সতেরোটি সংখ্যা
একটি কাল্পনিক গল্প
ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে আনিস সাহেব হঠাৎ থমকে গেলেন।
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
সতেরোটি ঘর। সতেরোটি সংখ্যা।
এই সতেরোটি সংখ্যাই কি তাঁর পুরো অস্তিত্ব?
আনিস সাহেব নম্বরটা লিখলেন। ১৯৭৮৫৬২৩৪৫৬৭৮৯০১২।
এই সংখ্যাগুলো তিনি মুখস্থ জানেন। নিজের নামের চেয়েও ভালো জানেন। কারণ নাম ভুলে গেলে কেউ কিছু বলে না। নম্বর ভুলে গেলে অস্তিত্ব শেষ।
কাউন্টারে গেলেন।
কর্মচারী ফর্ম নিলো। কম্পিউটারে টাইপ করলো।
“আপনার এনআইডি নম্বর ১৯৭৮৫৬২৩৪৫৬৭৮৯০১২?”
“হ্যাঁ।”
কর্মচারী স্ক্রিনে কিছু দেখলো। তারপর মাথা নাড়লো।
“হ্যাঁ, আপনি আছেন।”
আনিস সাহেব একটু হাসলেন। তিক্ত হাসি।
তিনি আছেন। কারণ কম্পিউটার বলছে আছেন। কম্পিউটার না বললে তিনি থাকতেন না।
এই উপলব্ধি প্রথম এসেছিল তিন বছর আগে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়ন করতে গিয়েছিলেন। নতুন কার্ড এলো। দেখলেন একটা সংখ্যা ভুল। ৭ এর জায়গায় ১।
“কোনো সমস্যা নেই, ঠিক করে দেবে” — ভেবে গেলেন ব্যাংকে।
“স্যার, আপনার নম্বর ম্যাচ করছে না।”
“কার্ডে ভুল আছে। আমার আসল নম্বর এটা।”
“কিন্তু সিস্টেমে তো এই নম্বর আছে।”
“সিস্টেম ভুল।”
কর্মচারী তাকালো। যেন অবিশ্বাস্য কিছু শুনেছে।
“স্যার, সিস্টেম ভুল হয় না। আপনি ভুল।”
সেদিন আনিস সাহেব টাকা তুলতে পারেননি। নিজের টাকা। নিজের অ্যাকাউন্ট। কিন্তু তিনি প্রমাণ করতে পারেননি যে তিনি তিনি।
পরের দুই সপ্তাহ ছিল দুঃস্বপ্ন।
নির্বাচন কমিশনে গেলেন। লাইন ধরলেন। ফর্ম পূরণ করলেন।
“সংশোধন হতে তিন মাস লাগবে।”
“তিন মাস? কিন্তু আমার জরুরি কাজ আছে!”
“সরি স্যার, নিয়ম।”
সেই তিন মাস আনিস সাহেব ছিলেন একজন অস্তিত্বহীন মানুষ।
ব্যাংকে যেতে পারতেন না। অফিসে হাজিরা দিতে পারতেন না — বায়োমেট্রিক ম্যাচ করতো না। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারতেন না। এমনকি মোবাইল সিম কিনতে পারতেন না।
তিনি ছিলেন, কিন্তু অফিশিয়ালি ছিলেন না।
সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে বদলে দিয়েছে।
এখন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নম্বরটা মনে মনে বলেন। ১৯৭৮৫৬২৩৪৫৬৭৮৯০১২। যেন নামাজের মতো। যেন মন্ত্র।
স্ত্রী রেহানা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী বলো সকালে?”
“আমার নম্বর।”
“নম্বর?”
“এনআইডি নম্বর।”
রেহানা অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু আনিস সাহেব বোঝাতে পারেননি কেন এটা জরুরি।
আনিস সাহেবের এক বন্ধু আছেন। নাম মাহবুব। তাঁর সাথে আরো ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে।
মাহবুবের নম্বর সিস্টেম থেকে মুছে গিয়েছিল।
কীভাবে গেল কেউ জানে না। টেকনিক্যাল গ্লিচ হয়তো। সার্ভার আপডেট হয়তো। কিন্তু একদিন সকালে মাহবুব গেলেন ব্যাংকে, শুনলেন — “আপনার নম্বর সিস্টেমে নেই।”
“মানে?”
“মানে আপনি নেই।”
মাহবুব হেসেছিলেন। “আমি তো সামনে দাঁড়িয়ে আছি!”
“স্যার, আপনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সিস্টেমে আপনি নেই।”
ছয় মাস লেগেছিল মাহবুবের “ফিরে আসতে।” ছয় মাস তিনি অফিশিয়ালি মৃত ছিলেন। জীবিত, কিন্তু মৃত।
আনিস সাহেবের ছেলে তাসনিম সেভেনে পড়ে।
গত মাসে তার জন্য একটা সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়েছিলেন।
“বাচ্চার জন্মসনদ নম্বর দিন।”
আনিস সাহেব নম্বর দিলেন।
কর্মচারী কম্পিউটারে দেখলো।
“বাচ্চা আছে।”
আনিস সাহেব ভাবলেন — বাচ্চা আছে। কম্পিউটার বলছে বলে আছে।
তাসনিম বারো বছর ধরে তাঁর সামনে আছে। হাসছে, খেলছে, পড়ছে। কিন্তু “অফিশিয়ালি” সে আছে কারণ তার একটা নম্বর আছে।
সেই নম্বর না থাকলে?
আনিস সাহেব কাঁপলেন।
রেহানার অসুখ হয়েছিল গত বছর।
হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ইমার্জেন্সি।
“রোগীর আইডি নম্বর?”
“এই নিন।”
নার্স কম্পিউটারে দেখলো।
“রোগী রেজিস্টার্ড। ভর্তি করা যাবে।”
আনিস সাহেব তখন ভাবলেন — যদি রেহানার নম্বর না থাকতো? যদি সিস্টেমে সে “না থাকতো”?
তাহলে কি ডাক্তার দেখাতো না?
মানুষ মরে যেত কিন্তু চিকিৎসা হতো না — কারণ সে “নেই”?
আনিস সাহেব হিসাব করে দেখেছেন।
তাঁর মোট কতগুলো নম্বর আছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র: ১৭ সংখ্যা। পাসপোর্ট: ৯ সংখ্যা। টিআইএন: ১২ সংখ্যা। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: ১৩ সংখ্যা। মোবাইল নম্বর: ১১ সংখ্যা। অফিস আইডি: ৮ সংখ্যা। ড্রাইভিং লাইসেন্স: ১৫ সংখ্যা।
মোট ৮৫টি সংখ্যা।
এই ৮৫টি সংখ্যাই তাঁর অস্তিত্ব। আনিস সাহেব নামটা শুধু একটা লেবেল। আসল পরিচয় এই সংখ্যাগুলো।
একদিন তাসনিম জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, মানুষ কি শুধু নম্বর?”
আনিস সাহেব চমকে উঠলেন।
“কেন জিজ্ঞেস করছিস?”
“স্কুলে আমাদের রোল নম্বর দিয়ে ডাকে। বাসায় নাম দিয়ে। কোনটা আসল?”
আনিস সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“বাসায় যেটা ডাকে, সেটা আসল।”
“কিন্তু স্কুলে তো নম্বর ছাড়া চলে না।”
“স্কুলে নম্বর দরকার। কিন্তু তুই নম্বর না। তুই তাসনিম।”
তাসনিম মাথা নাড়লো। বুঝলো কি বুঝলো না আনিস সাহেব জানেন না।
কিন্তু নিজেই কি বিশ্বাস করেন এই কথা?
রাতে শুয়ে আনিস সাহেব ভাবেন —
যদি সব সিস্টেম একদিন ক্র্যাশ করে?
যদি সব ডাটাবেস মুছে যায়?
তাহলে কি সবাই অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে?
কোটি কোটি মানুষ — সবাই “নেই”?
নাকি তখন আবার নাম ফিরে আসবে?
আনিস সাহেবের দাদা বলতেন, “আমাদের সময়ে কোনো নম্বর ছিল না। নাম ছিল। বাবার নাম ছিল। গ্রামের নাম ছিল। এটুকুই পরিচয়।”
“তখন কীভাবে চিনতো মানুষকে?”
“মুখ দেখে। কথা শুনে। চেনাজানা দিয়ে।”
আনিস সাহেব ভাবেন — সেই যুগ কতটা সহজ ছিল।
মানুষ ছিল মানুষ। সংখ্যা ছিল গণিতের বইয়ে।
এখন মানুষ নিজেই সংখ্যা হয়ে গেছে।
একদিন অফিসে একটা ঘটনা ঘটলো।
নতুন সফটওয়্যার এসেছে। সবার বায়োমেট্রিক আপডেট করতে হবে।
আনিস সাহেব গেলেন। আঙুল দিলেন স্ক্যানারে।
মেশিন বললো: “No match found.”
“আবার দিন।”
আবার দিলেন।
“No match found.”
আইটি এক্সপার্ট এলো। চেষ্টা করলো। কাজ হলো না।
“স্যার, আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সিস্টেমে নেই।”
আনিস সাহেবের বুক ধড়ফড় করতে লাগলো।
আবার সেই দুঃস্বপ্ন? আবার “নেই”?
দুই ঘণ্টা পর জানা গেল — সার্ভারে সমস্যা ছিল। ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু সেই দুই ঘণ্টা আনিস সাহেব যে আতঙ্ক অনুভব করেছেন, সেটা ভোলার নয়।
রেহানা বলেন, “তুমি বেশি ভাবো। নম্বর তো শুধু কাগজে। তুমি তো এখানে আছো।”
“এখানে আছি। কিন্তু কাগজে না থাকলে কী লাভ?”
“লাভ অনেক। আমি তোমাকে চিনি। তাসনিম চেনে। এটা কি যথেষ্ট না?”
আনিস সাহেব চুপ করে রইলেন।
যথেষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু এই দুনিয়ায় পরিবারের চেনা যথেষ্ট না। সিস্টেমের চেনা লাগে।
আজ রাতে আনিস সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছেন।
তারাগুলোর কোনো নম্বর নেই। চাঁদের কোনো আইডি কার্ড নেই। বাতাসের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই।
তারপরও তারা আছে।
কোটি কোটি বছর ধরে আছে।
কোনো সিস্টেম তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। তারপরও তারা জ্বলে।
আনিস সাহেব ভাবেন — মানুষও কি এভাবে থাকতে পারে না?
নম্বর ছাড়া? সিস্টেম ছাড়া?
উত্তর জানেন। পারে না। এই যুগে পারে না।
শুতে যাওয়ার আগে আনিস সাহেব অভ্যাসমতো নম্বরটা বললেন।
“১৯৭৮৫৬২৩৪৫৬৭৮৯০১২।”
রেহানা জিজ্ঞেস করলেন, “আজও বলছো?”
“প্রতিদিন বলব।”
“কেন?”
“ভুলে গেলে হারিয়ে যাব।”
রেহানা কিছু বললেন না। শুধু আনিস সাহেবের হাত ধরলেন।
সেই স্পর্শে কোনো নম্বর নেই। শুধু উষ্ণতা আছে।
আনিস সাহেব ভাবলেন — এই উষ্ণতা কোনো সিস্টেমে রেকর্ড নেই। কিন্তু এটাই সবচেয়ে সত্য।
কিন্তু সকালে উঠে আবার সেই একই দৌড়।
অফিসে বায়োমেট্রিক। ব্যাংকে এনআইডি। হাসপাতালে রোগী নম্বর।
সতেরোটি সংখ্যা ছাড়া কোনো কিছু হয় না।
আনিস সাহেব জানেন — তিনি আনিস। কিন্তু দুনিয়া জানে — তিনি ১৯৭৮৫৬২৩৪৫৬৭৮৯০১২।
এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা সত্য?
হয়তো দুটোই। হয়তো কোনোটাই না।
[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]
একটু ভাবনা রেখে যান