ব্লগ

সত্তার বিলুপ্তি ও পুনর্জন্ম

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

I.

তিনটা তেত্রিশে জেগে ওঠা মানে সময়ের ভেতর দিয়ে পড়ে যাওয়া। ঘড়ির কাঁটা একটি বিন্দু নির্দেশ করে, কিন্তু চেতনা সেই বিন্দুকে বিস্ফোরিত করে দেয়। রাত আর দিনের মধ্যবর্তী এই শূন্যতায় ‘আমি’ বলে যা ছিল, তা হয়ে ওঠে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

ওজুর পানি মুখে লাগার মুহূর্তে মনে হয় – এই পানি কি আমার চেহারা ধুয়ে দিচ্ছে, নাকি চেহারার নিচে লুকিয়ে থাকা মুখোশটিকে? কে এই ব্যক্তি যে আয়নায় দেখা যাচ্ছে? আমি, নাকি আমার ভেতরে বাস করা অপর কেউ?

II.

জায়নামাজে দাঁড়ানো মানে স্থানের সমস্ত মাত্রা ভেঙে দেওয়া। কিবলার দিকে মুখ করা মানে দিক বলে কিছু থাকে না – কেবল একটি অসীমের দিকে তাকানো, যেটি সামনে আছে, পেছনে আছে, ওপরে আছে, নিচে আছে। আমার চারপাশে নয়, আমার ভেতরে।

সেজদায় যাওয়ার মুহূর্তে মাথা নিচু হতে থাকে। কিন্তু এই নিচু হওয়াটি কি আসলে উঠে যাওয়া? কপাল মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে মনে হয় – পৃথিবী আমাকে ধরে রাখছে, নাকি আমি পৃথিবীকে ধরে রাখছি?

সেজদার মধ্যে থেকে উঠে আসা মানে কোথা থেকে ফিরে আসা? আমি কি সেখানে গিয়েছিলাম যেখানে ‘আমি’ বলে কিছু নেই? যেখানে কেবল একটি শ্বাস, একটি অস্তিত্ব, একটি সত্তা?

III.

হাত তোলার মুহূর্তে হাত দুটি আর আমার মনে হয় না। এগুলো দুটি পাখির ডানার মতো, যা আকাশের দিকে উড়ে যেতে চায়। কিন্তু কোন আকাশ? বাইরের, নাকি ভেতরের?

দোয়া করতে গিয়ে বুঝি – চাওয়া বলে কিছু নেই। আছে কেবল একটি খোলা হয়ে যাওয়া। একটি পাত্র হয়ে ওঠা, যাতে অসীম ঢুকে পড়তে পারে। চোখ বুজে থাকা অবস্থায় দেখতে পাই – অন্ধকার বলে কিছু নেই। আছে কেবল আলোর অনুপস্থিতি, নাকি আলোর এমন তীব্রতা যা দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়?

কান্নার ফোঁটাগুলো গাল বেয়ে নামার সময় মনে হয় – এগুলো কি আমার, নাকি আমার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কোনো নদীর? আমি কি কাঁদছি, নাকি অস্তিত্ব নিজেই কাঁদছে নিজের জন্য?

IV.

নামাজ শেষ করে বসে থাকার মুহূর্তে সময় থেমে যায়। কিন্তু এই থেমে যাওয়াটি কি আসলে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে চলা? যেন একটি চাকা এত জোরে ঘুরছে যে মনে হয় স্থির হয়ে আছে।

এই নিস্তব্ধতার মধ্যে শুনতে পাই – নিরবতার আওয়াজ। এটি কোনো শব্দের অনুপস্থিতি নয়, বরং সমস্ত শব্দের উৎস। যেখান থেকে সমস্ত কথা জন্ম নেয়, সমস্ত অর্থ বেরিয়ে আসে।

আমি এখানে আছি, নাকি এখানে আমার অনুপস্থিতি আছে? যেখানে ‘আমি’ ছিল, সেখানে এখন একটি শূন্যতা। কিন্তু এই শূন্যতা ভরপুর – সমস্ত সম্ভাবনায়, সমস্ত অস্তিত্বে।

V.

ফজরের আজান আসতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু আমি জানি না আমি কোথায় আছি। যে ব্যক্তি এই বাড়িতে এসেছিল, সে আর নেই। যে এখন বসে আছে, সে অন্য কেউ। নাকি সে-ই, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুনভাবে জন্ম নিয়ে?

মৃত্যু বলে কিছু নেই, আছে কেবল রূপান্তর। জন্ম বলে কিছু নেই, আছে কেবল প্রকাশ। আমি মরে গিয়েছি এই রাতে, আবার জন্ম নিয়েছি। প্রতিদিন এই মৃত্যু ও জন্ম ঘটে, কিন্তু আমরা দেখি না।

তাহাজ্জুদ শেষে যে উঠে দাঁড়ায়, সে আর সেই ব্যক্তি নয় যে নামাজে দাঁড়িয়েছিল। সে একটি নতুন সত্তা – পুরনো অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন চেতনা নিয়ে।

এই রাতে আমি শিখেছি – অস্তিত্ব মানে নিরন্তর বিলুপ্তি ও পুনর্জন্ম। প্রতিটি শ্বাসে মৃত্যু, প্রতিটি নিঃশ্বাসে জন্ম। প্রতিটি মুহূর্তে শেষ হয়ে যাওয়া, প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে শুরু হওয়া।

আমি আর আমি নই। আমি হয়ে উঠেছি এমন কিছু, যার কোনো নাম নেই।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *