ব্লগ

সত্যের শিল্পী

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আপনার অফিসে কী কাজ?” আমি বললাম, “গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্ট।” সত্য হলো—এক্সেল শিট এডিট করি। কিন্তু “গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্ট” শুনতে ভালো লাগে। আরাশের চোখে বাবা একটা হিরো থাকে।

এটা কি মিথ্যা, নাকি সত্যের সুন্দর রূপ?

অফিসে বস জিজ্ঞেস করে, “কাজ কেমন চলছে?” আমি বলি, “খুব ভালো। আরো দুই দিনে শেষ।” সত্য হলো—অনেক সমস্যা। এক সপ্তাহ লাগবে। কিন্তু সত্য বললে বসের মুখ কালো হবে। আমার ওপর চাপ বাড়বে।

এটা কি মিথ্যা, নাকি সম্পর্ক বাঁচানোর কৌশল?

স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, “আজ কেমন দেখাচ্ছি?” নতুন শাড়ি পরেছে। আমার তেমন ভালো লাগেনি। কিন্তু বলি, “খুব সুন্দর।” কারণ তার খুশি দেখতে ভালো লাগে।

এটা কি মিথ্যা, নাকি ভালোবাসার ভাষা?

মাঝে মাঝে ভাবি—মিথ্যা কি সবসময় খারাপ? নাকি মিথ্যার মধ্যেও সৃজনশীলতা আছে?

মিথ্যা বলতে কল্পনাশক্তি লাগে। এক সেকেন্ডে নতুন সত্য তৈরি করতে হয়। যেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। যেটা যুক্তিসঙ্গত হবে। এটা কি শিল্প নয়?

লেখকরা মিথ্যা গল্প লেখেন। অভিনেতারা মিথ্যা চরিত্র অভিনয় করেন। পরিচালকরা মিথ্যা জগৎ তৈরি করেন। এগুলো শিল্প। তাহলে দৈনন্দিন জীবনের মিথ্যা?

অবশ্য সব মিথ্যা এক নয়।

প্রেমিক যখন প্রেমিকাকে বলে, “তুমিই আমার প্রথম ভালোবাসা,” সেটা হয়তো মিথ্যা। কিন্তু সেই মিথ্যায় একটা কবিতা আছে। একটা স্বপ্ন আছে।

আবার কেউ যদি টাকা চুরি করে বলে “করিনি,” সেটা অন্য ধরনের মিথ্যা। সেখানে সৃজনশীলতা নেই। আছে ভয়।

মিথ্যার পেছনে উদ্দেশ্যটা গুরুত্বপূর্ণ।

ছোটবেলায় মা বলতেন, “মিথ্যা বলা পাপ।” কিন্তু মা নিজেই বলতেন, “ডাক্তার আঙ্কেল ইনজেকশন দিলে ব্যথা হবে না।” সেটা কি পাপ, নাকি সন্তানের ভয় দূর করার চেষ্টা?

সমাজ চলে মিথ্যার ওপর। “ভালো আছি,” “সুন্দর লাগছে,” “সমস্যা নেই”—এই মিথ্যাগুলো না থাকলে সামাজিকতা চলে?

কিন্তু মিথ্যার অভ্যাস হয়ে গেলে ভয়ানক। তখন সত্য আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য ভুলে যাই। নিজের কাছেও মিথ্যা বলা শুরু করি।

“আমি ভালো আছি” বলতে বলতে নিজেই বিশ্বাস করে ফেলি। অথচ ভেতরে ভাঙা।

সবচেয়ে ভয়ানক মিথ্যা—নিজের কাছে মিথ্যা। “আমি খুশি,” “আমি সন্তুষ্ট,” “আমার কোনো সমস্যা নেই।” এই মিথ্যাগুলো কোনো সৃজনশীলতা নয়। আত্মপ্রতারণা।

তবুও কিছু মিথ্যা সুন্দর। কিছু মিথ্যা প্রয়োজনীয়। কিছু মিথ্যা ভালোবাসার অংশ।

আরাশকে বলি, “বাবার কোনো ভয় নেই।” মিথ্যা। কিন্তু সে নিরাপদ বোধ করে।

স্ত্রীকে বলি, “সব ঠিক হয়ে যাবে।” নিশ্চিত নই। কিন্তু আশা জিইয়ে রাখতে চাই।

হয়তো মিথ্যা বলা একটা শিল্প। সত্যকে সুন্দর করে পরিবেশন করার শিল্প। অন্যদের খুশি রাখার শিল্প। নিজেকে বাঁচানোর শিল্প।

কিন্তু প্রশ্ন থাকে—কোন মিথ্যা শিল্প, কোনটা প্রতারণা?

উত্তর সহজ নয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *