আজ সকালে চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য একটা অফিসে গিয়েছিলাম। অপেক্ষার ঘরে দেখলাম একটা তরুণ ছেলে বসে আছে। তার হাতে সার্টিফিকেটের ফাইল। স্বর্ণপদক, বৃত্তি, সম্মাননা। কিন্তু তার চোখে হতাশা।
“কী হয়েছে ভাই?”
“স্যার, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। কিন্তু এই তিন মাসে পঞ্চাশটা সাক্ষাৎকার দিয়েছি। কেউ নেয় না।”
“কেন?”
“বলে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নেই। তারা চায় যে ইতিমধ্যে কাজ জানে।”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “শিক্ষা বনাম বাস্তবতার ফাঁক ভার্সন নিষ্ঠুর”।
বাসে ফেরার পথে দেখি একটা মেয়ে ফোনে কাঁদছে। “আম্মা, আমি তো সব নিয়ম মেনে চলেছি। কিন্তু অফিসে যারা কাজ পায়, তারা সবাই দুর্নীতি করে।”
স্কুলে তাকে শেখানো হয়েছে সততাই সেরা নীতি। কিন্তু চাকরির জগতে দেখছে সততা একটা বাধা।
রাস্তায় দেখি একটা ব্যাংকের সামনে কিছু তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কথা শুনলাম। “ভাই, সিভি তে মিথ্যা অভিজ্ঞতা লিখতে হয়। না হলে কল পর্যন্ত পাওয়া যায় না।”
আরেকজন বলল, “আমার এক বন্ধু ভুয়া কোম্পানির নাম দিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। এখন ভালো চাকরি করছে।”
স্কুলে শেখানো হয়েছিল মিথ্যা বলা পাপ। এখানে মিথ্যা বলা দক্ষতা।
ট্রেনে উঠে দেখি একটা মধ্যবয়সী মানুষ তার পাশের তরুণকে পরামর্শ দিচ্ছে। “বাবা, তুমি খুব সরল। এই পৃথিবীতে সরল মানুষের জায়গা নেই। তোমাকে চালাক হতে হবে।”
তরুণটি বলল, “কিন্তু আঙ্কেল, আমাদের তো শেখানো হয়েছে সরলতাই মানুষের সেরা গুণ।”
মধ্যবয়সী মানুষটি হেসে বলল, “সেটা ছিল স্কুলের গল্প। এখন বাস্তব জীবন।”
চায়ের দোকানে বসে দেখি দুইজন ব্যবসায়ী কথা বলছে। একজন বলছে, “আমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি করতাম। এখন সেই যোগাযোগই কাজে লাগছে।”
আরেকজন বলল, “হ্যাঁ। আমার ছেলে শুধু পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এখন কোথাও ঢুকতে পারছে না।”
স্কুলে শেখানো হতো পড়াশোনাই সব। এখানে দেখছি যোগাযোগই সব।
সরকারি অফিসে গিয়ে দেখি একটা তরুণী কাঁদছে। “স্যার, আমার সব কাগজপত্র ঠিক আছে। তবুও কেন আমার কাজটা হচ্ছে না?”
কর্মচারী বলল, “আপা, এখানে কাগজপত্র থাকলেই হয় না। আরও কিছু ‘ব্যবস্থা’ করতে হয়।”
মেয়েটি বলল, “আমি বুঝি না এই ব্যবস্থা মানে কী।”
কর্মচারী হেসে বলল, “এটা স্কুলে শেখায় না।”
হাসপাতালে গিয়ে দেখি একটা যুবক ডাক্তারের পিছনে ছুটছে। “ডাক্তার সাহেব, আমার বাবার অপারেশন জরুরি। অনুগ্রহ করে দ্রুত ব্যবস্থা করুন।”
ডাক্তার বলল, “ভাই, এখানে জরুরি মানে ‘অতিরিক্ত পেমেন্ট’। তা না হলে লাইনে দাঁড়াতে হবে।”
যুবক হতভম্ব হয়ে বলল, “কিন্তু ডাক্তাররা তো মানুষের সেবা করেন।”
ডাক্তার হাসল, “সেটা পাঠ্যবইয়ের কথা।”
আদালতের সামনে দেখি একটা পরিবার বসে আছে। বাবা বলছে, “আমরা ভেবেছিলাম ন্যায়বিচার পাব। কিন্তু এখানেও টাকার খেলা।”
ছেলে বলল, “বাবা, আমাদের শিক্ষক বলতেন আদালতে সবাই সমান।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ছেলে, সেটা ছিল আদর্শের কথা। এটা বাস্তব।”
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। স্কুল আমাদের একটা সুন্দর পৃথিবীর ছবি দেখিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী অন্যরকম।
স্কুলে শেখানো হয়েছে:
- পরিশ্রম করলে সফল হবে
- সততায় মুক্তি
- যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি
- ন্যায়বিচার সবার জন্য
কিন্তু বাস্তবে দেখছি:
- যোগাযোগ থাকলে সফল হবে
- চতুরতায় মুক্তি
- দুর্নীতিই একমাত্র উপায়
- টাকাওয়ালাদের জন্য ন্যায়বিচার
স্কুল আমাদের একটা সুরক্ষিত খাঁচায় রেখেছিল। সেখানে শিক্ষকরা ছিলেন দেবতা, নিয়মকানুন ছিল পবিত্র।
কিন্তু খাঁচার বাইরে এসে দেখলাম – এই পৃথিবী একটা জঙ্গল। এখানে বেঁচে থাকতে হলে জঙ্গলের নিয়ম শিখতে হয়।
স্কুল আমাদের ভেড়া বানিয়েছে। কিন্তু পৃথিবী নেকড়েদের জন্য।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা – স্কুলে যা শেখায়, জীবনে তার উল্টোটাই সত্য।
একটু ভাবনা রেখে যান