ব্লগ

সুখ

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি আর আরাশ টিভিতে একটা সিরিয়াল দেখছিল। হাসছিল দুজনে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাদের হাসি শুনে ভালো লাগল।

ভালো লাগল কেন?

তানভীর অফিসে এসে বলল, “দেখ, নতুন গাড়ি কিনেছি।”

আমি বললাম, “ভালো তো।”

তানভীর হাসল। আমিও হাসলাম।

কফি খেতে খেতে ভাবলাম, তানভীর খুশি কেন? গাড়ি তো শুধু একটা জিনিস।

আমি খুশি কেন? এটা তো আমার গাড়ি না।

জামিউর ফোন করল। বলল, “ভাই, বেতন বেড়েছে।”

“অভিনন্দন।”

“পরিবারটাকে এবার কিছু দিতে পারব।”

ফোন রাখার পর চা বানালাম। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। খাইনি।

আরাশ স্কুল থেকে ফিরে বলল, “বাবা, পরীক্ষায় ভালো করেছি।”

আমি বললাম, “খুব ভালো।”

আরাশ ব্যাগ রেখে খেলতে চলে গেল। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আরাশ খুশি কেন? নম্বর তো শুধু একটা সংখ্যা।

আমি খুশি হয়েছিলাম কেন?

রবিবার সকালে হ্যাপি চা বানায়। ধীরে। রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসে।

হ্যাপি বলে, “এই দিনগুলো ভালো।”

আমি বলি, “হুম।”

হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি সুখী?”

আমি বলি, “জানি না।”

হ্যাপি আর কিছু বলে না। চা ঢালে।

সাইফুল হজ থেকে ফিরে এসে বলল, “ভাই, অন্যরকম শান্তি।”

“কেমন?”

“বলা যায় না। কিন্তু ছিল।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এখন?”

সাইফুল চুপ করে রইল।

মৃদুল কানাডা থেকে ফোন করে। বলে, “এখানে সব ভালো। কিন্তু কেমন লাগে ভাই।”

“কী লাগে?”

“জানি না। সব আছে। কিন্তু কিছু নেই।”

আমি বললাম, “আচ্ছা।”

ফোন রেখে জানালার বাইরে তাকালাম। রাস্তায় একটা বাচ্চা হাঁটছে। একা।

বড় ভাই আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আমি কয়েকদিন ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি।

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কান্না করছ?”

আমি বললাম, “না।”

আরাশ বলল, “চোখ লাল।”

আমি বললাম, “ধুলো পড়েছে।”

আরাশ চুপ করে আমার পাশে বসল।

দেয়া বোনের বিয়ের দিন আমি ছবি তুলছিলাম। সবাই হাসছিল। আমিও হাসলাম।

রাতে বাড়ি ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগল?”

আমি বললাম, “ভালো।”

“সত্যিই?”

আমি কিছু বললাম না।

নামাজ পড়ার পর মাঝে মাঝে ভালো লাগে। শান্ত। মাঝে মাঝে লাগে না।

আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, সুখ কী?”

আমি বললাম, “জানি না।”

আরাশ বলল, “তুমি বড় মানুষ। তুমিও জানো না?”

আমি বললাম, “না।”

আরাশ বলল, “আচ্ছা।”

তারপর আরাশ খেলতে গেল। আমি বারান্দায় বসে রইলাম।

অফিস ছাড়ার পর প্রথম কয়েক মাস ভালো লেগেছিল। নতুন। তারপর একদিন সকালে উঠে ভাবলাম, এখন কী করব?

হ্যাপি বলল, “তুমি তো যা চেয়েছিলে তাই পেয়েছ।”

আমি বললাম, “হুম।”

“তাহলে?”

“জানি না।”

আয়নায় মুখ দেখি প্রতিদিন। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই লোকটা কে?

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটা করি, সেটা কি আমার? নাকি আমি শিখেছি?

ব্রাশ করার সময় মুখ দেখি আয়নায়। চোখদুটো দেখি। অচেনা লাগে।

হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি কী ভাবো সারাদিন?”

আমি বললাম, “কিছু না।”

“সত্যিই?”

“সত্যিই।”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর রান্নাঘরে চলে গেল।

আরাশ স্কুল থেকে ফিরে বলল, “বাবা, আমার বন্ধু বলল তার বাবা অনেক খুশি থাকে।”

আমি বললাম, “আচ্ছা।”

আরাশ বলল, “তুমি খুশি থাক না কেন?”

আমি বললাম, “আমি খুশি আছি।”

আরাশ আমার দিকে তাকাল। কিছু বলল না।

রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি মাঝে মাঝে। আকাশের দিকে তাকাই। তারা দেখি।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “কী দেখছ?”

আমি বলি, “কিছু না।”

“আসো, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

আমি আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর ভেতরে আসি।

তানভীরের গাড়ি দেখে আমার ভালো লেগেছিল। কেন লেগেছিল? জামিউরের বেতন বাড়ায় আমার খুশি লেগেছিল। কেন?

আরাশের নম্বর দেখে আমি খুশি হয়েছিলাম। সত্যিই খুশি হয়েছিলাম? নাকি আমি ভেবেছিলাম খুশি হওয়া উচিত?

হ্যাপি যখন হাসে, আমার ভালো লাগে। এটা কি আমার অনুভূতি? নাকি আমি শিখেছি যে এটা ভালো লাগা উচিত?

রাতে ঘুমানোর আগে হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “তুমি ঠিক আছ?”

আমি বলি, “হুম।”

“সত্যিই?”

আমি চুপ করে থাকি। হ্যাপিও চুপ করে থাকে।

তারপর আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।

সকালে উঠি। চা বানাই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখি।

একটা কাক ডাকছে। গাছে বসে।

আমি চা খাই। গরম। জিভ পুড়ে যায়। কিন্তু খাই।

আরাশ ঘুম থেকে উঠে বলে, “বাবা, আজ স্কুল যেতে ইচ্ছা করছে না।”

আমি বলি, “কেন?”

“জানি না। করছে না।”

আমি বলি, “আচ্ছা। কিন্তু যেতে হবে তো।”

আরাশ বলে, “হুম।”

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে ডাকে, “নাস্তা প্রস্তুত।”

আমরা তিনজন বসি। খাই। কেউ কথা বলি না।

মা মারা যাওয়ার পর বাবা অনেক কম কথা বলতেন। একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “বাবা, তুমি কি সুখী?”

বাবা বলেছিলেন, “সুখ কী জিনিস?”

আমি কিছু বলিনি। বাবাও আর কিছু বলেননি।

এখন আমিও কম কথা বলি। আরাশ একদিন হয়তো আমাকে জিজ্ঞেস করবে, “বাবা, তুমি কি সুখী?”

আমি কী বলব?

রাতে শুয়ে থাকি। ছাদের দিকে তাকিয়ে। ফ্যান ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে।

হ্যাপি ঘুমিয়ে পড়েছে। শ্বাসের আওয়াজ। নিয়মিত।

আমি চোখ বন্ধ করি। খুলি। আবার বন্ধ করি।

সুখ কি এই? নাকি ওই?

মৃদুল বলেছিল, “সব আছে। কিন্তু কিছু নেই।”

আমি বুঝেছিলাম। কিন্তু বলিনি।

সাইফুল বলেছিল, “বলা যায় না। কিন্তু ছিল।”

আমিও বলতে পারি না। কিন্তু জানি।

না, জানি না।

হয়তো জানি।

হয়তো কেউই জানে না।

সকালে আবার উঠব। চা বানাব। বারান্দায় দাঁড়াব।

আরাশ স্কুলে যাবে। হ্যাপি রান্না করবে। আমি বসে থাকব।

এটা কি সুখ?

জানি না।

জানালার বাইরে একটা পাখি উড়ছে। কোথায় যাচ্ছে? জানে কি সে?

আমি জানালা বন্ধ করি। ঘরে ফিরি।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “কী হলো?”

আমি বলি, “কিছু না।”

“চল, চা খাই।”

আমরা চা খাই। চুপচাপ।

আরাশ খেলছে। হাসছে।

আমি দেখছি। ভালো লাগছে।

কেন?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *