ব্লগ

শূন্যের দিকে তাকিয়ে

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়িতে দেখলাম তিনটা বাজে। পাশে হ্যাপি গভীর ঘুমে। আরাশও ওর ছোট্ট বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আমি উঠে বারান্দায় গেলাম।

আকাশ দেখলাম। এত তারা। এত নীরবতা। হঠাৎ মনে হলো – এই বিশাল মহাবিশ্বে আমি কেন আছি? আমার এই অস্তিত্বের মানে কী?

মাথায় একটা অদ্ভুত ভার। যেন কেউ প্রশ্ন করছে – “হায়দার, তুমি কী করছো এখানে? তোমার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই যাত্রার কী অর্থ?”

আমি ভাবলাম, আমার বাবা কি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন? যখন উনার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছিলো, যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিলেন, তখন কি ভেবেছিলেন – “আমি কেন এলাম? কেন যাচ্ছি?”

উনি তো ভেবেছিলেন আমি আর আমার ভাই-বোনরা তাঁর অর্থ। আমরাই তাঁর অস্তিত্বের সার্থকতা। কিন্তু আমি? আমার অর্থ কী?

আরাশ কি আমার অর্থ? সে যখন আমাকে “বাবা” বলে ডাকে, যখন হাসে, যখন কোনো কিছু নিয়ে উত্সুক হয়ে প্রশ্ন করে – তখন কি আমার অস্তিত্ব সার্থক হয়? নাকি এটাও একটা ভ্রম, যে আমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তৈরি করি?

হ্যাপির প্রতি আমার ভালোবাসা কি আমার অস্তিত্বের কারণ? ওর জন্য দায়িত্ব, ওর সুখের জন্য চেষ্টা – এসব কি আমাকে অর্থ দেয়? নাকি এগুলো শুধু জৈবিক তাড়না, যা আমার ভেতর প্রকৃতি ঢুকিয়ে দিয়েছে?

আমি মসজিদে যাই, নামাজ পড়ি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি। আমার বিশ্বাস, তিনি আমাকে কোনো উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য কী? আমি কি শুধু পরীক্ষার জন্য এসেছি? পাপ-পুণ্যের হিসাব মিলিয়ে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য?

তাহলে এই পুরো খেলাটার মানে কী? জন্ম, বেড়ে ওঠা, সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ, আর মৃত্যু। একটা নিখুঁত যন্ত্রের মতো চলতে থাকা। কিন্তু কেন?

কখনো মনে হয়, আমার অস্তিত্বের অর্থ খোঁজা নিজেই একটা ভুল। হয়তো অর্থ বলে কিছু নেই। আমি আছি, এটাই যথেষ্ট। বাঁচছি, এটাই সব। আর কোনো গভীর উদ্দেশ্য নেই।

কিন্তু তাহলে কেন এত কষ্ট? কেন এত সংগ্রাম? কেন আমি প্রতিদিন চাকরি খুঁজি, টাকার জন্য ভাবি, পরিবারের জন্য চিন্তা করি? যদি সবকিছুই অর্থহীন হয়, তাহলে আমি থামি না কেন?

হয়তো এখানেই আমার উত্তর। আমি থামি না কারণ আমার ভেতরে কিছু একটা আছে যা বলে – “চালিয়ে যাও।” সেই কিছুটা কী? আশা? ভালোবাসা? বিশ্বাস? নাকি শুধুই অভ্যাস?

আরাশের কথা মনে পড়লো। সে একদিন বলেছিলো, “বাবা, আমি কেন আছি?” আমি তখন হেসে বলেছিলাম, “তুমি আছো কারণ আমরা তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমার উত্তরটা অসম্পূর্ণ ছিলো।

হয়তো আমরা আছি কারণ প্রশ্ন করতে পারি। কারণ ভাবতে পারি। কারণ অনুভব করতে পারি। অন্য কোনো প্রাণী কি রাত তিনটায় উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, “আমি কেন আছি?”

হয়তো এই প্রশ্ন করাটাই আমাদের অস্তিত্বের অর্থ। খোঁজা, জানতে চাওয়া, বুঝতে চেষ্টা করা। উত্তর পাওয়া নয়, প্রশ্ন করাটাই আসল।

আল্লাহ হয়তো আমাদের এজন্যই পাঠিয়েছেন। যেন আমরা তাঁকে খুঁজি। তাঁর সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করি। নিজেদের চিনতে চেষ্টা করি।

সকাল হতে শুরু করেছে। পাখিরা ডাকছে। শীঘ্রই আরাশ আর হ্যাপি জেগে উঠবে। আমি আবার আমার ভূমিকায় ফিরে যাবো – একজন বাবা, একজন স্বামী, একজন মানুষ যে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে।

কিন্তু এই মুহূর্তে, এই নীরবতায়, আমি জানি – আমার প্রশ্নগুলো আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এগুলো আমাকে মানুষ করে তুলেছে। এগুলো আমার অস্তিত্বের প্রমাণ।

হয়তো অর্থ খোঁজাটাই অর্থ। হয়তো প্রশ্ন করাটাই উত্তর।

আমি ভেতরে যাবো। হ্যাপিকে চা বানিয়ে দেবো। আরাশকে স্কুলের জন্য তৈরি করবো। আজকের মতো আমার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখবো।

আর রাতে, আবার প্রশ্ন করবো।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

অর্থ

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *