ব্লগ

হাতের মুঠোয় গণিত, মাথায় শূন্য

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“৩৭৮ গুণ ২৪ কত?” – জামিউর জিজ্ঞেস করতেই আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল ফোন বের করা। কিন্তু জামিউর বলল, “না না, ক্যালকুলেটর ছাড়া বল।”

আমার মাথা ব্ল্যাঙ্কে হয়ে গেল। ৩৭৮ গুণ ২৪। এটা তো খুব কঠিন কিছু না। ছোটবেলায় আমরা এমন অনেক কঠিন অঙ্ক করতাম। কিন্তু এখন? এখন আমি হিসাব করতেই পারি না।

আমি বললাম, “আরে যাক, আমার কাছে তো ক্যালকুলেটর আছে। এত কষ্ট করে মাথায় হিসাব করব কেন?” কিন্তু ভিতরে ভিতরে লজ্জা লাগল। আমি কি সত্যিই এত অক্ষম হয়ে গেছি?

জামিউর হেসে বলল, “ভাই, তুমি তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছ। ক্যালকুলাস, ইন্টিগ্রেশন সব করেছ। এখন একটা সিম্পল গুণ করতে পার না?”

এই কথাটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা। তখন আমি জটিল জটিল অঙ্ক করতাম। লগারিদম, ত্রিকোণমিতি, ক্যালকুলাস – সব মাথায় রাখতাম। আর এখন?

আরাশ এসে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি গণিত পার না?” আমি বললাম, “পারি তো। ক্যালকুলেটর দিয়ে।” আরাশ বলল, “আমি তো মাথায় করতে পারি।” ১১ বছরের বাচ্চা আমার চেয়ে ভালো গণিত জানে।

এই অবস্থাটা আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলল। আমি একটা প্রজন্মের প্রতিনিধি যারা প্রযুক্তির উপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে নিজের মৌলিক দক্ষতাগুলো হারিয়ে ফেলেছে।

মনে পড়ে, আমার দাদু দোকানে বসে মাথায় হিসাব করতেন। কোনো ক্যালকুলেটর নেই, কিন্তু প্রতিটা লেনদেনের হিসাব সঠিক। আর আমি? আমি ২০ টাকার সাথে ৫ টাকা যোগ করতেও ফোন বের করি।

হ্যাপি বলল, “হায়দার, তুই তো আগে খুব ভালো গণিত পারতিস। এখন কী হয়েছে?” আমি বললাম, “দরকারই নেই। ক্যালকুলেটর তো আছেই।”

কিন্তু সত্যিই কি দরকার নেই? নাকি আমি একটা অজুহাত দিচ্ছি আমার অলসতাকে ঢাকার জন্য?

আমি চেষ্টা করলাম মাথায় ৩৭৮ গুণ ২৪ করতে। প্রথমে ৩৭৮ কে ভেঙে ফেললাম – ৩০০ + ৭০ + ৮। তারপর প্রতিটাকে ২৪ দিয়ে গুণ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মাঝপথেই গোলমাল হয়ে গেল।

অবশেষে ফোন বের করে ক্যালকুলেটর খুললাম। ৩৭২ x ২৪ = ৯০৭২। এত সহজ! কিন্তু আমার মাথায় কেন হল না?

আমি বুঝলাম, আমার মস্তিষ্কের যে অংশ গাণিতিক চিন্তার জন্য দায়ী, সেটা ব্যবহার না করার কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। যেমন শরীরের মাসল ব্যবহার না করলে দুর্বল হয়ে যায়।

রাতে ভাবলাম – আমি কি এমন একটা যুগে বাস করছি যেখানে মানুষের মৌলিক দক্ষতাগুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে? যেখানে চিন্তা করার চেয়ে গুগল করা সহজ?

আমার পকেটে যেই ক্যালকুলেটর আছে, সেটা আমার গণিতের দক্ষতাকে উন্নত করেছে, নাকি নষ্ট করেছে?

একদিন যদি এই প্রযুক্তি না থাকে? যদি ব্যাটারি শেষ হয়ে যায়? তখন কী হবে? আমি কি আবার মাথায় হিসাব করতে পারব?

নাকি আমি এমন একটা প্রজন্মের হয়ে গেছি যারা প্রযুক্তি ছাড়া অসহায়? যাদের কাছে “আমার কাছে ক্যালকুলেটর আছে” মানেই “আমার গণিত জানার দরকার নেই”?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *