
একটা পাখি প্রতিদিন আসে।
একটা মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে।
এবং মনে করে — এই দেখাটা গভীর কিছু।
এটা গভীরতা না। এটা পালানো।
“কী ভাবছ?” — কেউ জিজ্ঞেস করে।
“কিছু না।”
এই দুটো শব্দ মানুষ সারাজীবন বলে।
কিছু না মানে — আমি জানি কী ভাবছি, কিন্তু বললে জবাব দিতে হবে। জবাব দিলে বদলাতে হবে। বদলানো ভয়ের।
তাই কিছু না।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো এই “কিছু না।”
একটা বাচ্চা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল — যারা স্বপ্ন দেখে না, তারা মরে গেলে কোথায় যায়?
বড়রা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না।
কারণ বড় হওয়া মানে এই প্রশ্নটা ভুলে যাওয়া শেখা।
বড় হওয়া মানে মেনে নেওয়া যে স্বপ্ন দেখার বয়স পার হয়ে গেছে।
এবং এই মেনে নেওয়াটাকেই পরিপক্কতা বলা।
মানুষ সারাজীবন কিছু একটা খোঁজে।
কিন্তু সত্যিকার খোঁজা বিপজ্জনক — পেয়ে গেলে বদলাতে হয়।
তাই মানুষ খোঁজার অভিনয় করে।
না পাওয়াটাকে নিয়তি বলে।
এবং শান্তিতে ঘুমায়।
মৃত্যুর সময় হাত ধরে থাকা — মানুষ এটাকে ভালোবাসা বলে।
এটা ভালোবাসা না।
এটা নিজের জন্য।
কারণ ছেড়ে দিলে মানতে হয় — এটা শেষ।
মানুষ শেষ মানতে পারে না।
তাই ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাত ধরে বসে থাকে।
এবং নিজেকে বলে — এটা ভালোবাসা।
রাত কঠিন লাগে কারণ রাতে পালানো যায় না।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো — দিনে কোথায় পালায় মানুষ?
কাজে। কথায়। ব্যস্ততায়।
এবং এই পালানোকেই জীবনযাপন বলে।
সেজদায় কপাল ঠেকলে শান্তি লাগে কয়েক সেকেন্ড।
উঠে দাঁড়ালেই সব ফিরে আসে।
কেন?
কারণ ওই কয়েক সেকেন্ড “আমি” ছিল না।
উঠে দাঁড়াতেই “আমি” ফিরে আসে।
এবং “আমি” মানেই যন্ত্রণা।
ধর্ম এটাই বলে এসেছে হাজার বছর ধরে।
মানুষ নামাজ পড়ে — কিন্তু এই একটা কথা শোনেনি।
“জানি না” বলা সততা।
কিন্তু জেনেও না করা — এটার কোনো নাম নেই।
কারণ মানুষ এটাকে নাম দিতে চায় না।
নাম দিলে নিজেকে দেখতে হয়।
একাকীত্ব মানে মানুষের অনুপস্থিতি না।
একাকীত্ব মানে নিজের থেকে পালিয়ে এমন জায়গায় যাওয়া যেখানে নিজেও নেই।
মানুষে ভরা ঘরে বসে যে শূন্যতা লাগে —
সেটা ঘরের শূন্যতা না।
সেটা নিজের শূন্যতা।
এবং এই শূন্যতা কেউ ভরাট করতে পারে না।
কারণ যে জায়গাটা খালি, সেখানে অন্য কেউ থাকার কথা না।
সেখানে নিজেকে থাকতে হয়।
থাকা মানে স্মৃতিতে থাকা — মানুষ এটা বিশ্বাস করে।
কারণ ভুলে যাওয়ার ভয়ই সবচেয়ে বড় ভয়।
কিন্তু যে মানুষ নিজেই উপস্থিত না — সে কীভাবে স্মৃতিতে থাকবে?
স্মৃতিতে থাকতে হলে আগে এখানে থাকতে হয়।
এখন।
এই মুহূর্তে।
পাখি দেখতে দেখতে না।
পাখিটা প্রতিদিন আসে।
তাকায়।
উড়ে যায়।
পাখিটা কিছু খোঁজে না।
পাখিটা শুধু বাঁচে।
পুরোপুরি।
এখনই।
মানুষ পাখি দেখে বলে — “কী স্বাধীন।”
আসলে মানুষ বলতে চায় — “আমি যা হতে পারিনি।”
অপেক্ষার শেষ নেই।
কারণ মানুষ জানে না কীসের অপেক্ষা।
এবং না জেনে অপেক্ষা করাটাকেই বলে — জীবন চলছে।
জীবন চলছে না।
সময় যাচ্ছে।
দুটো এক জিনিস না।
একটু ভাবনা রেখে যান