আরাশের বন্ধু রিয়ানের জন্মদিন। কেক কাটার সময় হয়েছে। সবাই একত্রিত হয়েছি “হ্যাপি বার্থডে” গান গাওয়ার জন্য। এবং যেই না গান শুরু হয়েছে, অমনি বুঝে গেছি এটা একটা শব্দ দূষণের মহোৎসব হতে যাচ্ছে। বিশজন মানুষের বিশ রকম সুর, বিশ রকম তাল, বিশ রকম উচ্চারণ।
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…” শুরু হল গান। কিন্তু কী এক বিপদ! আমি গাইছি এক সুরে, পাশের আন্টি গাইছেন অন্য সুরে। আরাশ গাইছে তার নিজের মতো করে। হ্যাপি আমার কানের কাছে এত জোরে গাইছে যে মনে হচ্ছে কানের পর্দা ফেটে যাবে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল সবাই আলাদা আলাদা সময়ে শেষ করছে। কেউ “টু ইউ” তে শেষ করছে, কেউ “হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার রিয়ান” পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে পুরো গানটা হয়ে যাচ্ছে একটা অদ্ভুত কোলাহল।
আমি নিজেও জানি আমার গলা ভালো নয়। কিন্তু জন্মদিনের গান তো গাইতেই হয়। এটা একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা। না গাইলে মনে হবে আমি অসভ্য।
রিয়ানের বাবা খুব উৎসাহের সাথে গাইছেন। তার গলা এত জোরে যে মনে হচ্ছে তিনি একা ১০ জনের শব্দ করছেন। আর তার সুর! যেন তিনি অন্য একটা গান গাইছেন।
আরাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে মুখ নাড়ছে কিন্তু তেমন কোনো আওয়াজ বের করছে না। বুদ্ধিমান ছেলে। সে বুঝে গেছে এই কোরাসে অংশ না নেওয়াই ভালো।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমরা এই যন্ত্রণা নিজেদের ওপর চাপিয়ে নিই? কেউ তো গান পারে না, তবুও গাইছি।”
সবচেয়ে হাস্যকর লাগে যখন দেখি কিছু মানুষ গান শেষ হওয়ার পরেও গাইতে থাকে। তারা বুঝতেই পারে না অন্যরা থেমে গেছে।
হ্যাপি আমার কানে বলল, “তুমি কেন থেমে গেলে?” আমি বললাম, “গলা শুকিয়ে গেছে।” সত্যি কথা হল, এই বেসুরো গান শুনতে শুনতে গলা নয়, মাথাই শুকিয়ে গেছে।
গান শেষ হওয়ার পর সবাই তালি দিল। কিসের তালি? আমাদের এই বেসুরো গায়কীর জন্য? নাকি গান শেষ হয়েছে বলে স্বস্তির তালি?
রিয়ান হাসছে। সে খুশি। হয়তো তার কাছে সুরের চেয়ে ভালোবাসাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যতই বেসুরো গান গাই না কেন, সে বুঝতে পারছে আমরা তার জন্য গাইছি।
বাড়ি ফেরার পথে আরাশ বলল, “আব্বু, সবাই কেন এত বেসুরো গান গায়?” আমি বললাম, “সবাই তো আর শিল্পী না।” কিন্তু মনে মনে ভাবলাম, সত্যিই তো কেন?
হয়তো এটাই জন্মদিনের গানের সৌন্দর্য। এটা কোনো কনসার্ট নয়। এটা ভালোবাসার প্রকাশ। সুর খারাপ হলেও আবেগটা ঠিক থাকে।
পরদিন অফিসে জামিউরের জন্মদিন। আবার সেই একই দৃশ্য। আবার সেই বেসুরো কোরাস। কিন্তু এবার আমি একটু বেশি সচেতনভাবে গাইলাম। চেষ্টা করলাম অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে গাইতে।
ফলে একটু ভালো হল। অন্তত আমার অংশটুকু। কিন্তু পুরো কোরাস এখনো সেই একই অবস্থা।
এক সহকর্মী বলল, “আমাদের একসাথে গান শেখা দরকার।” সবাই হেসে ফেলল। কিন্তু ভাবলাম, সত্যিই যদি আমরা সবাই একসাথে গান শিখতাম?
কিন্তু সেটা কি প্রাকৃতিক হত? এই বেসুরো গানের মধ্যেই একটা স্বাভাবিকতা আছে। আমরা সবাই সাধারণ মানুষ। আমাদের গান শিল্পীদের মতো হবে না।
হয়তো এটাই ভালো। জন্মদিনের গান যদি খুব সুন্দর হয়ে যায়, তাহলে তার সরলতা হারিয়ে যাবে। এই বেসুরো গানেই আছে আমাদের আন্তরিকতা।
একটু ভাবনা রেখে যান