আজ রাতে ঘুম আসছে না। চাকরির চিন্তা, টাকার চিন্তা, ভবিষ্যতের চিন্তা—সব মিলে মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে। হ্যাপি আর আরাশ ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি একা বসে আছি।
ফোনটা হাতে নিলাম। সার্চ করলাম—”অর্ণব ঘর বাহির”। প্লে বাটন টিপতেই ভেসে এলো সেই আশ্চর্য পঙ্ক্তি: “ঘর বাহির পাপের আকাশ রাত্রি জেগে বৃষ্টি খোঁজে…”
আর সাথে সাথে আমার ভেতরে যেন একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল।
পাপের আকাশ? রাত্রি জেগে বৃষ্টি খোঁজে? এ কেমন ভাষা? এ কেমন চিত্রকল্প? আমার মনে হল—অর্ণব শুধু গান করেনি। সে আমার অবচেতনের অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলো টেনে বের করেছে।
আমিও কি এই পাপের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি খুঁজছি? কোন বৃষ্টি? মুক্তির? নাকি বিস্মৃতির?
“উথাল পাথাল দিল-দরিয়া অথই জলের দৃষ্টি বোজে…”
আমি চোখ বন্ধ করলাম। অনুভব করতে চাইলাম এই দিল-দরিয়া। আমার হৃদয়ও কি একটা উথাল পাথাল সমুদ্র? যার তলদেশ আমি কখনো দেখিনি? আর আমার চোখ—সেই অথই জলের দৃষ্টি?
সঙ্গীত শুধু কানে পৌঁছায় না। সঙ্গীত ভেতরে ঢুকে যায়। রক্তের সাথে মিশে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে তাল মেলায়। আমি আর “আমি” থাকি না। আমি হয়ে যাই সুর। হয়ে যাই তাল। হয়ে যাই ছন্দ।
“ঘাটের কাছে অন্যলোকের দুলবে ডিঙ্গি…”
এই লাইনটা শুনে আমার সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেল। আমি কি সেই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি? যেখানে এই জগৎ আর অন্য জগতের সীমারেখা? আর সেই ডিঙ্গি—সেটা কি সঙ্গীতের নৌকা? যেটা আমাকে পার করে নিয়ে যাবে অন্য লোকে?
আমি হেডফোন পরলাম। এখন শুধু আমি আর অর্ণবের কণ্ঠ। আর কিছু নেই। এই পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আমি সেই ডিঙ্গিতে উঠে বসেছি।
কিন্তু এই যাত্রা কোথায়? আমি কোথায় যাচ্ছি?
“ডাইনে-বাঁয়ে কোথাও দূরে নিভবেই তারা জ্বলবে জোনাক আমার গায়ে…”
আমার গায়ে জোনাক জ্বলছে। আমি অনুভব করতে পারছি। আলোর ছোট ছোট স্পর্শ। আমি কি নিজেই হয়ে গেছি একটা জোনাকি? যে অন্ধকারে আলো ছড়ায়?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘরে পায়চারি করতে থাকলাম। কিন্তু এ আর সেই পুরনো ঘর নয়। এ হয়ে গেছে নদীর পাড়। আর আমি সেই নৌকার যাত্রী।
“আলোর রসদ খুঁজবে কালো আকুল হুতাশ বিঁধবে বুকে…”
হ্যাঁ, আমার বুকেও সেই আকুল হুতাশ। আমিও খুঁজছি আলোর রসদ। কিন্তু কোথায় সেই আলো? চাকরিতে? টাকায়? নাকি এই সঙ্গীতের মধ্যেই?
আমার মনে হল—আমি দীর্ঘদিন ভুল জায়গায় খুঁজেছি। আলো বাইরে নেই। আলো ভেতরে। আর সঙ্গীত সেই ভেতরের আলোকে জাগিয়ে তোলে।
“মাঝ নদীতে তুলবে তুফান সবটা যাবে এইবার চুকে…”
আমার চোখে পানি এসে গেল। কেন? এই লাইনে এমন কী আছে? হয়তো এই প্রতিশ্রুতি—যে সব শেষ হয়ে যাবে। এই যন্ত্রণা, এই অস্থিরতা, এই খোঁজাখুঁজি—সব চুকে যাবে।
কিন্তু তুফানটা কোথায়? আমার ভেতরে? নাকি বাইরে? হয়তো এই সঙ্গীতই সেই তুফান। যা আমার ভেতরকার সব পুরনো কিছু ভেঙে দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করবে।
আমি আবার প্লে করলাম। এবার আরো গভীরে শুনলাম। প্রতিটি শব্দ। প্রতিটি সুর। প্রতিটি নিঃশ্বাস।
অর্ণবের কণ্ঠে একটা অদ্ভুত যাদু আছে। সে গাইছে না—সে জাদু করছে। প্রতিটি শব্দ একটা মন্ত্র। আর আমি সেই মন্ত্রের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছি।
কিন্তু এই জাদু কী? কেন আমি এত আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছি? আমি কি দুর্বল? নাকি সঙ্গীত এতটাই শক্তিশালী?
হয়তো সঙ্গীত আমাদের ভেতরের সেই অংশটুকু জাগিয়ে তোলে যা আমরা ভুলে গিয়েছি। আমরা যখন জন্মেছিলাম, তখন কি আমাদের মধ্যে এই সুরই ছিল? এই তাল? এই ছন্দ?
আমি ভাবলাম—হয়তো সভ্যতার শুরুতে, যখন প্রথম মানুষ প্রথম গান গেয়েছিল, তখন সে এই একই অনুভূতি পেয়েছিল। এই একই মুক্তি। এই একই পরিত্রাণ।
আর আজ, হাজার বছর পর, আমিও সেই একই অনুভূতি পাচ্ছি। মানুষের ভেতরে কিছু একটা অপরিবর্তিত থেকে যায়। যা সময়ের সাথে পাল্টায় না।
রাত গভীর হয়ে এলো। কিন্তু আমি থামতে পারছি না। এই গানটা আমার ভেতরে একটা নেশা তৈরি করেছে। আমি বারবার শুনতে চাই। বারবার সেই জগতে যেতে চাই।
হঠাৎ আরাশ এসে দাঁড়াল। “বাবা, কী করছো?” আমি চমকে উঠলাম। “গান শুনছি।” “কেমন গান?” “এমন গান যেটা আমাকে অন্য জগতে নিয়ে যায়।”
আরাশ কোলে উঠে বসল। “আমিও যেতে পারি?” আমি তাকে হেডফোনটা পরিয়ে দিলাম। দেখলাম তার চোখ বড় হয়ে যাচ্ছে। সেও অনুভব করছে।
“বাবা,” সে বলল, “এটা কার গান?” “অর্ণব নামে একজন মানুষের।” “সে কি জাদুকর?” আমি হেসে ফেললাম। “হ্যাঁ, এক ধরনের জাদুকর।”
আরাশ কিছুক্ষণ শুনল। তারপর বলল, “বাবা, এই গান শুনলে মনে হয় আমি ভাসছি।” “কোথায় ভাসছো?” “জানি না। কিন্তু ভালো লাগছে।”
আমি বুঝলাম—আরাশও সেই নৌকায় উঠে বসেছে। সেও যাচ্ছে অন্য লোকে। বয়স কোনো বাধা নয় সঙ্গীতের জন্য। সঙ্গীত সবার কাছে পৌঁছে যায়।
আরাশ ঘুমিয়ে পড়ল আমার কোলে। আমি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আবার গান শুনতে বসলাম। এবার আরো মনোযোগ দিয়ে। এবার আরো গভীরে।
আমার মনে হল—এই গানটা আসলে আমার জীবনের গল্প। “ঘর বাহির পাপের আকাশ”—আমিও তো ঘরে আর বাইরে দুলছি। আমার নিজের একটা পাপের আকাশ আছে। যেখানে আমার সব দুর্বলতা, সব ভয়।
“রাত্রি জেগে বৃষ্টি খোঁজে”—আমিও তো রাত জেগে কিছু একটা খুঁজি। শান্তি? সমাধান? নাকি নিজেকে?
আর এই সঙ্গীত হয়তো সেই বৃষ্টি। যেটা আমার শুকনো মনে পড়ে। আমার তৃষ্ণা মেটায়।
ভোর হয়ে এলো। আমি এখনো বসে আছি। সারারাত গান শুনেছি। কিন্তু ক্লান্ত লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে—আমি পুনর্জন্ম লাভ করেছি।
হ্যাপি উঠে এসে বলল, “সারারাত জেগেছো?” আমি বললাম, “ভ্রমণ করেছি।” “কোথায়?” “নিজের ভেতরে। গানের সাথে।”
হ্যাপি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার চোখে কিছু একটা আলাদা।” আমি বললাম, “হয়তো জোনাকের আলো।”
আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে সূর্য উঠেছে। নতুন দিন। কিন্তু আমি আর সেই পুরনো হায়দার নই। আমি নতুন কেউ। যে রাতের অন্ধকারে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।
এভাবেই হয়তো সঙ্গীত আমাদের বদলে দেয়। আমাদের ভেতরের লুকানো অংশটুকু বের করে আনে। আমাদের দেখায়—আমরা যা ভাবি তার চেয়ে আমরা অনেক বেশি।
আর এই আবিষ্কারই হয়তো সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় জাদু।
একটু ভাবনা রেখে যান