সিগনেচার শিকারি
একটি কাল্পনিক গল্প
কামরুল সাহেব পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তিনি একজন শিকারি — সিগনেচার শিকারি।
গল্পের শুরু একটা সাধারণ কাগজ দিয়ে। কামরুল সাহেবের মেয়ে তানজিলার স্কুল ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দরকার। ফর্ম পূরণ করা, ছবি দেওয়া — সব হয়ে গেছে। শুধু একটা জিনিস বাকি: উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সিগনেচার।
দশ সেকেন্ডের কাজ। একটা কলম, একটা নাম।
সেই দশ সেকেন্ডের খোঁজে কামরুল সাহেব এখন পর্যন্ত বাইশ দিন ছুটি নিয়েছেন, সাতাশ হাজার টাকা যাতায়াতে খরচ করেছেন, এবং চারটা জেলা ঘুরেছেন।
সিগনেচার এখনো মেলেনি।
প্রথম দিন অফিসে গেলেন সকাল দশটায়। পিয়ন বললো, “স্যার মিটিংয়ে।”
“কখন আসবেন?”
“বলা যায় না।”
দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা। স্যার এলেন না। পরের দিন আবার।
“স্যার ফিল্ড ভিজিটে।”
তৃতীয় দিন।
“স্যার অসুস্থ।”
চতুর্থ দিন।
“স্যার ঢাকায় গেছেন, ট্রেনিং।”
পঞ্চম দিন গিয়ে জানলেন — স্যার বদলি হয়ে গেছেন। নতুন স্যার আসবেন পরের মাসে।
নতুন অফিসার এলেন। তরুণ, উদ্যমী চেহারা। কামরুল সাহেব ভাবলেন এবার হবে।
গেলেন ফাইল নিয়ে। অফিসার দেখলেন।
“এই ফাইল তো আগের অফিসারের সময়ে ওপেন হয়েছে। তাঁর সিগনেচার লাগবে।”
“কিন্তু স্যার, উনি তো বদলি হয়ে গেছেন।”
“তাহলে ওখানে যান।”
“কোথায় গেছেন জানেন?”
“রেকর্ডে দেখেন।”
রেকর্ড ঘেঁটে জানলেন — পুরনো অফিসার এখন অন্য জেলায়। বাসে চার ঘণ্টার পথ।
সেই জেলায় গিয়ে অফিস খুঁজে পেতে আরো দুই ঘণ্টা। অফিসে ঢুকে জানলেন — উনি আবার বদলি হয়েছেন। এবার ঢাকায়।
কামরুল সাহেব ভাবলেন, এই মানুষ কি পালাচ্ছেন তাঁর কাছ থেকে?
ঢাকায় গেলেন। সেক্রেটারিয়েটের কাছে একটা অফিস। সেখানে গিয়ে জানলেন — উনি এখন এই বিভাগে নেই। অন্য মন্ত্রণালয়ে ট্রান্সফার হয়েছেন।
সেই মন্ত্রণালয়ে গেলেন। গেটে আটকে দিলো।
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”
“নেই।”
“তাহলে ঢুকতে পারবেন না।”
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গেলেন। তিন সপ্তাহ পরের ডেট পেলেন।
তিন সপ্তাহ পর গেলেন। এবার ঢুকতে পারলেন। অফিসার সাহেবকে খুঁজে পেলেন।
তিনি ফাইল দেখলেন। মুখ গম্ভীর।
“এই ফাইল তো অনেক পুরনো। এখন এটা আমার এখতিয়ারে নেই।”
“কিন্তু স্যার, আপনিই তো ফাইল ওপেন করেছিলেন।”
“সেটা আমি ঐ পদে থাকতে। এখন আমি অন্য পদে।”
“তাহলে কে সিগনেচার দেবে?”
“যিনি এখন ঐ পদে আছেন।”
কামরুল সাহেব প্রথম জেলায় ফিরে গেলেন। সেই নতুন অফিসারের কাছে।
তিনি বললেন, “আমি তো আগেই বলেছি, আগের অফিসারের সিগনেচার লাগবে।”
“স্যার, উনি বলছেন এখন ওনার এখতিয়ার নেই।”
“তাহলে উনার কাছ থেকে একটা NOC আনেন।”
“NOC?”
“হ্যাঁ, No Objection Certificate। উনি যে আপত্তি করছেন না, সেটার প্রমাণ।”
আবার ঢাকা। আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আবার তিন সপ্তাহ।
কামরুল সাহেবের স্ত্রী রুমানা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এখনো সেই সার্টিফিকেটের পেছনে?”
“হ্যাঁ।”
“এত দিন?”
“সিগনেচার পাচ্ছি না।”
রুমানা চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “তানজিলার নতুন স্কুলে অ্যাডমিশন ডেডলাইন পরের মাসে।”
কামরুল সাহেব জানেন। সব জানেন। কিন্তু সিগনেচার ছাড়া কিছু হবে না।
একদিন রাতে তানজিলা জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি সারাদিন কী করো?”
“সিগনেচার খুঁজি।”
“সিগনেচার কী?”
“একটা নাম। কেউ একজন নিজের নাম লিখবে, তাহলে তোমার কাগজ কাজ করবে।”
“শুধু নাম লিখলেই হবে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এত কঠিন কেন?”
কামরুল সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না। কারণ তিনি নিজেও জানেন না।
এই যাত্রায় কামরুল সাহেব অনেক কিছু শিখেছেন।
শিখেছেন কোন অফিসে কখন চা বিরতি হয়। কোন পিয়ন কত টাকায় খবর দেয়। কোন দিন কোন অফিসার মুডে থাকেন।
শিখেছেন “আসেন” মানে আসবেন না। “দেখি” মানে হবে না। “ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছি” মানে ফাইল হারিয়ে গেছে।
শিখেছেন একটা সিগনেচারের জন্য পুরো পরিবারের সময়, টাকা, মানসিক শান্তি — সব বিসর্জন দিতে হয়।
গত সপ্তাহে একটা মজার ঘটনা ঘটলো।
অফিসে অপেক্ষা করছেন কামরুল সাহেব। পাশে একজন বয়স্ক মানুষ বসা। কথা হলো।
জানলেন, তিনি দুই বছর ধরে একটা জমির দলিলের জন্য সিগনেচার খুঁজছেন। তিনজন অফিসার বদলি হয়েছেন এই সময়ে। একজন অবসরে গেছেন।
“দুই বছর?”
“হ্যাঁ ভাই। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। সপ্তাহে দুইদিন আসি, বাকি দিন সংসার করি।”
তিনি হাসলেন। কামরুল সাহেবও হাসলেন। দুজনের হাসিতে একটা চাপা যন্ত্রণা।
কামরুল সাহেব মাঝে মাঝে ভাবেন — এই সিস্টেম কে বানিয়েছে?
কেন একটা সার্টিফিকেটের জন্য মাসের পর মাস লাগে? কেন একজন অফিসার বদলি হলে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু? কেন একটা সিগনেচারের এত দাম?
উত্তর পান না। শুধু বোঝেন — এই সিস্টেমে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো ফাইল, নোট, সিল, সিগনেচার।
মানুষ শুধু এই যন্ত্রের জ্বালানি।
গতকাল একটা খবর পেলেন।
যে অফিসার NOC দেবেন, তিনি নাকি অবসরে যাচ্ছেন পরের মাসে।
মানে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে? নতুন অফিসার, নতুন ফাইল, নতুন অপেক্ষা?
রুমানা বললেন, “থাক। তানজিলাকে অন্য স্কুলে দিই। যেখানে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট লাগবে না।”
কিন্তু কামরুল সাহেব হাল ছাড়তে পারছেন না। ছয় মাস খরচ করেছেন। এত কষ্ট। এত টাকা। এত সময়।
এখন ছেড়ে দিলে সব বৃথা।
কিন্তু আসলে কি বৃথা?
এই ছয় মাসে কামরুল সাহেব কী পেয়েছেন?
হতাশা। ক্লান্তি। রাগ। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অপমান।
আর কী পেয়েছেন?
তানজিলার সাথে সময় কাটাতে পারেননি। রুমানার সাথে ঝগড়া বেড়েছে। নিজের কাজে মন দিতে পারেননি।
একটা সিগনেচারের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনে সই করতে ভুলে গেছেন।
আজ রাতে শুতে যাওয়ার আগে কামরুল সাহেব ভাবলেন — আগামীকাল আবার যাবো তো?
উত্তর দিতে পারলেন না।
শুধু জানেন, সকালে উঠে আবার সেই একই রাস্তা। সেই একই অফিস। সেই একই অপেক্ষা।
কারণ সিগনেচার ছাড়া কিছু হয় না।
এবং সিগনেচার কখনো মেলে না।
তুমি যদি কখনো কোনো অফিসের সামনে একটা লম্বা লাইন দেখো, জেনো — ওরা সবাই শিকারি। সিগনেচার শিকারি।
ওদের চোখে ক্লান্তি। পকেটে ফাইল। মুখে একটাই প্রশ্ন।
“স্যার আছেন?”
[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।]
একটু ভাবনা রেখে যান