ব্লগ

স্মৃতি মুছে ফেলার যন্ত্রণা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“Storage Full. Delete some photos to continue taking pictures.” – এই নোটিফিকেশনটা দেখতেই আমার মনে হল যেন কেউ আমাকে বলেছে – “তোমার স্মৃতির কিছু অংশ মুছে ফেল।” কিন্তু কোনগুলো মুছব? কোন মুহূর্তকে বিদায় জানাব?

আমি গ্যালারি খুললাম। ৪৮৯৭টি ছবি। প্রতিটির সাথে জড়িয়ে আছে একটা গল্প, একটা মুহূর্ত, একটা অনুভূতি। কোথা থেকে শুরু করব? কোন স্মৃতিটা কম গুরুত্বপূর্ণ?

প্রথমেই চোখে পড়ল আরাশের ছবি। ওর জন্মের দিন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্ত। প্রথম হাসি, প্রথম দাঁত, প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলের দিন। এগুলো কি মুছতে পারব? এগুলো তো ওর শৈশব। ওর ইতিহাস।

তারপর হ্যাপির সাথে ছবিগুলো। বিয়ের দিনের, হানিমুনের, বিভিন্ন উৎসবের। এক একটা ছবিতে এক একটা খুশির দিন বন্দী হয়ে আছে। এগুলো মুছলে তো মনে হবে সেই দিনগুলোই মুছে গেল।

পরিবারের ছবিগুলো দেখলাম। বাবার শেষ কয়েকটা ছবি। এগুলো কি মুছব? বাবা তো আর নেই। এই ছবিগুলোই তো উনার একমাত্র অস্তিত্বের প্রমাণ।

বন্ধুদের সাথে ছবি। জামিউর, সাইফুল, মৃদুল। কত আড্ডা, কত হাসি-ঠাট্টা। সবার সাথে তো এখন আর সেভাবে দেখা হয় না। এই ছবিগুলোই তো সেই দিনগুলোর সাক্ষী।

ভ্রমণের ছবিগুলো স্ক্রল করলাম। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট। প্রতিটা জায়গার সৌন্দর্য, প্রতিটা মুহূর্তের আনন্দ। এগুলো মুছলে তো মনে হবে সেই যাত্রাগুলোই হয়নি।

খাবারের ছবিও অনেক। বিশেষ দিনের বিশেষ খাবার। হ্যাপির রান্না করা প্রিয় তরকারি। রেস্টুরেন্টের সুন্দর পরিবেশন। এগুলো দেখলে মনে পড়ে যায় সেই স্বাদ, সেই আনন্দ।

আমি বুঝলাম, এই ছবিগুলো শুধু ছবি নয়। এগুলো আমার জীবনের অধ্যায়। প্রতিটা ছবি একটা গল্প বলে। একটা আবেগ প্রকাশ করে।

কিন্তু তাহলে কোনগুলো মুছব? কোন স্মৃতিকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলব?

আমি শুরু করলাম ডুপ্লিকেট ছবি খুঁজতে। একই জিনিসের একাধিক ছবি। কিন্তু দেখলাম প্রতিটারই একটু আলাদা অ্যাঙ্গেল। একটু আলাদা লাইট। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ – সেটা নির্ধারণ করা কঠিন।

তারপর ভাবলাম অস্পষ্ট ছবিগুলো মুছে ফেলি। কিন্তু দেখলাম সেগুলোর মধ্যেও অনেক আবেগ। হয়তো একটা দৌড়ের মুহূর্ত, বা একটা হাসির ঝাপসা দৃশ্য।

হ্যাপি এসে বলল, “কী করছিস?” আমি বললাম, “ফোনে জায়গা নাই। কিছু ছবি মুছতে হবে।” হ্যাপি বলল, “ক্লাউড স্টোরেজ কিন না।” আমি বললাম, “তাতে টাকা লাগে।”

কিন্তু আসল কথা হল, টাকার চেয়েও বড় ব্যাপার হল – কোন স্মৃতিকে বেছে নেব, কোনটাকে ত্যাগ করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আমি অবশেষে কিছু স্ক্রিনশট মুছলাম। কিছু অপ্রয়োজনীয় মিম। কিছু দোকানের বিল। কিন্তু এতে মাত্র ২০০-৩০০ মেগাবাইট জায়গা ফাঁকা হল। আরো চাই।

শেষমেষ বাধ্য হয়ে কিছু পুরনো ভ্রমণের ছবি মুছলাম। মনে মনে বলি – “আমি তোমাদের ভুলে যাবো না, কিন্তু জায়গার অভাবে তোমাদের বিদায় দিতে হচ্ছে।”

প্রতিটা ছবি ডিলিট করার সময় মনে হচ্ছিল যেন আমার স্মৃতির একটা টুকরো হারিয়ে যাচ্ছে। আমি কি একটা ডিজিটাল ভোলা মানুষ হয়ে যাচ্ছি?

রাতে ভাবলাম – আগে মানুষ কী করত? একটা অ্যালবাম। কয়েকটা প্রিয় ছবি। এখন? এখন আমরা প্রতিটা মুহূর্তের ছবি তুলি, কিন্তু পরে সেগুলো মুছে ফেলতে বাধ্য হই।

কোনটা ভালো? অল্প কিছু ছবি যেগুলো চিরকাল থাকবে? নাকি হাজারো ছবি যেগুলো একদিন মুছে যাবে?

আমার মনে হয়, আমরা স্মৃতি সংগ্রহ করতে গিয়ে স্মৃতি হারিয়ে ফেলছি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *