ব্লগ

সব বয়সের হায়দার

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দেখি পাশে পাঁচ বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো বড় বড়। মুখে কৌতূহল।

সে বলছে, “আমি বড় হলে কী হব?”

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পেছনে পনেরো বছরের এক কিশোর। স্কুলের পোশাক পরা। বইয়ের ব্যাগ কাঁধে।

সে বলছে, “আমি কলেজে যাব। ডাক্তার হব।”

আরেক দিকে তাকিয়ে দেখি পঁচিশ বছরের যুবক। হাতে চাকরির ইন্টারভিউ লেটার।

সে বলছে, “আমি চাকরি পেয়ে যাব। বিয়ে করব।”

ডান দিকে পঁয়ত্রিশ বছরের পুরুষ। আরাশকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সে বলছে, “আমি ভালো বাবা হব।”

আর সামনে ষাট বছরের এক বৃদ্ধ। কাঁপা হাতে লাঠি ধরে আছেন।

তিনি বলছেন, “আমি শান্তিতে মরব।”

আমি মধ্যখানে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছি। উনচল্লিশ বছরের হায়দার।

কিন্তু কোনটা আসল আমি?

পাঁচ বছরের ছেলেটা কাছে এসে বলল, “তুমি কে?”

আমি বললাম, “আমি তুমি। ভবিষ্যতের।”

সে বলল, “আমি এত দুঃখী হব কেন?”

আমার মুখে কথা নেই।

কিশোরটা এসে বলল, “আমি তো স্বপ্ন দেখতাম। সেগুলো কোথায় গেল?”

আমি বললাম, “হারিয়ে গেছে।”

যুবকটা বলল, “আমার উৎসাহ কোথায়? আমার বিশ্বাস কোথায়?”

আমি বললাম, “ভেঙে গেছে।”

বাবা হয়ে ওঠা মানুষটা বলল, “আমি তো ভেবেছিলাম সংসার পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আমি বললাম, “হয়নি।”

বৃদ্ধ মানুষটা বলল, “আমি তো ভাবছিলাম বুড়ো হলে শান্তি পাব।”

আমি বললাম, “পাবে না।”

তারপর সবাই একসাথে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমাদের জীবনের মানে কী?”

আমি চুপ করে রইলাম। কারণ জানি না।

ছোট ছেলেটা কাঁদতে শুরু করল। “আমি বড় হব না। আমি এভাবেই থাকব।”

কিশোরটা বলল, “আমি স্বপ্ন দেখা বন্ধ করব না।”

যুবকটা বলল, “আমি হাল ছাড়ব না।”

বাবা হয়ে ওঠা মানুষটা বলল, “আমি আরাশকে ভালোবাসা দেব।”

বৃদ্ধ মানুষটা বলল, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাব না।”

কিন্তু আমি কী বলব? আমি যে মাঝখানে আটকে।

হঠাৎ বুঝলাম, এই সবগুলো আমিই। একসাথে। একই সময়ে।

আমার ভেতরে এখনো সেই কৌতূহলী শিশু আছে। স্বপ্নবাজ কিশোর আছে। উৎসাহী যুবক আছে। দায়বদ্ধ বাবা আছে। ক্লান্ত বৃদ্ধও আছে।

তাহলে আমি কেন মনে করি আমি শুধু একটা বয়সের মানুষ?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সবার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম।

“আমরা সবাই একসাথে আছি। তাহলে একসাথে কিছু করি।”

শিশুটা বলল, “আমি কৌতূহল দেব।”

কিশোরটা বলল, “আমি স্বপ্ন দেব।”

যুবকটা বলল, “আমি সাহস দেব।”

বাবাটা বলল, “আমি দায়বদ্ধতা দেব।”

বৃদ্ধ বললেন, “আমি জ্ঞান দেব।”

আমি বললাম, “আমি সবাইকে একসাথে নিয়ে চলব।”

আয়নায় তাকিয়ে দেখি এখন শুধু আমি আছি। কিন্তু আমার চোখে সবার ছাপ।

হয়তো আমি কখনোই একা ছিলাম না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *