বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতির একটি শান্ত পুকুরে বাঁধা নৌকার রঙিন দৃশ্য, যা জীবনের নীরব দর্শক হয়ে থাকার মনস্তাত্ত্বিক রূপককে তুলে ধরে।

জীবন

অন্যের চোখে নিজেকে দেখা: আমরা কি নিজের জীবনেরই দর্শক?

সেপ্টেম্বর ২০২৫ · 10 মিনিটে পড়া
শেয়ার
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতির একটি শান্ত পুকুরে বাঁধা নৌকার রঙিন দৃশ্য, যা জীবনের নীরব দর্শক হয়ে থাকার মনস্তাত্ত্বিক রূপককে তুলে ধরে।
তীরে বাঁধা নৌকার মতো আমরাও অনেক সময় থমকে থাকি; নিজের জীবন বাঁচার বদলে কেবল দূর থেকে নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখি।

দর্শক

তুমি তোমার জীবন বাঁচছ না। তুমি তোমার জীবন দেখছ। বাইরে থেকে। দর্শকের মতো।


ঘরের কোণ

কারো বাড়ি। অনেক মানুষ। চা হাতে নিলাম, তিনবার চুমুক দিলাম, কাপ টেবিলে রাখলাম।

একজন হাসল। আমিও হাসলাম।

তারপর হঠাৎ নিজেকে দেখলাম — ওখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক, হাত নাড়ছে, হাসছে, কথা বলছে। সেই লোকটা আমি।

কিন্তু আমি তখন সেখানে ছিলাম না। আমি ছিলাম বাইরে, দেখছিলাম।

হাসিটা কি ঠিক হলো? মাথা কি এভাবে নাড়তে হয়?

আর থাকতে পারলাম না। বাইরে বের হলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিলাম।


যে ছেলেটা নাচত

ছোটবেলায় মাঝরাতে নাচতাম। দুপুরে নাচতাম। কেউ দেখছে কিনা ভাবতাম না, কারণ কেউ দেখছে কিনা সেটা মাথায় আসতই না।

এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াই, কিন্তু নিজেকে দেখি না। দেখি অন্যরা কী দেখবে।

জামা পরার সময় ভাবি এটা কি ঠিক হবে, হাঁটার সময় ভাবি কেমন দেখাচ্ছে। আয়না আমার সাথে কথা বলে না, বলে তাদের সাথে যারা সেখানে নেই।


হাত তোলা হলো না

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন। শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, উত্তর জানি, কিন্তু হাত তুলতে পারলাম না।

যদি ভুল হয়? যদি হাসে?

অন্য কেউ উত্তর দিল। সেই উত্তর আমারই জানা ছিল।

রাতে ঘরে ফিরে দেয়ালকে সব বললাম, কারণ দেয়াল শোনে কিন্তু বিচার করে না।


মিটিং

সাদা টেবিল। সবাই চুপ। মাথায় একটা ভালো জিনিস আছে, কিন্তু বলতে পারছি না।

মিটিং শেষ হলো। কিছু বললাম না।

পরের সপ্তাহে সেই একই কথা অন্য কেউ বলল। সবাই বলল চমৎকার।

বাড়ি ফিরে চা বানালাম। ঠান্ডা হয়ে গেল। খাইনি।


সত্যিটা কোথায়

বন্ধু বলল — তুই খুব গম্ভীর।

বললাম — আমি তো ভাবি আমি হাসিখুশি।

সে বলল — না, তুই চুপচাপ থাকিস, কী ভাবছিস বোঝা যায় না।

সেই রাতে অনেকক্ষণ ভাবলাম। আমি নিজেকে যেমন দেখি, অন্যরা আমাকে তেমন দেখে না। তাহলে সত্যিটা কোথায়?

একদিন পরীক্ষা করলাম। সারাদিন যা মনে এল বললাম, কেউ কী ভাবছে ভাবলাম না।

সন্ধ্যায় বন্ধু বলল — আজ তোকে স্বাভাবিক লাগছে।

তার মানে বাকি দিনগুলোতে আমি অস্বাভাবিক ছিলাম।

পরের দিন আবার একই।


ছেলে

সকালে ছেলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছিল। কিন্তু সে নিজের দিকে তাকাচ্ছিল না, তাকাচ্ছিল এমনভাবে যেন অন্য কেউ দেখছে।

বুক চিনচিন করল।

সে শুরু করেছে। এই খেলা।

কিছু বললাম না। কী বলব? বলব এটা করিস না? কিন্তু আমি নিজেই পারিনি।

সে চলে গেল। দরজা বন্ধ হলো।


দর্শক

এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য।

তুমি একটা দর্শক হয়ে গেছ। তোমার নিজের জীবনের।

তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছ, ভেতরে ঢুকছ না। হাসলে দেখছ হাসিটা ঠিক হলো কিনা, কথা বললে দেখছ কথাটা ঠিক শোনাল কিনা, চললে দেখছ চলাটা ঠিক দেখাচ্ছে কিনা।

কিন্তু যাকে দেখাতে চাইছ, সে নেই।

সেই দর্শক তোমার মাথার ভেতরে বাস করে। বাইরে কেউ নেই। কেউ তোমাকে এত মনোযোগ দিয়ে দেখছে না। তারা নিজেদের দেখছে।

কিন্তু তুমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছ না।


রাতে

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কাছের মানুষ বলল — তোমাকে মাঝে মাঝে খুব দূরে লাগে, যেন তুমি এখানে নেই।

আমি কিছু বললাম না।

সে ঠিকই বলেছে। আমি এখানে নেই। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছি।

সমস্যা হলো ভেতরে ফেরার রাস্তা ভুলে গেছি।


একটাই প্রশ্ন

কাল সকালে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াব। চুল আঁচড়াব। জামা পরব।

এবং দেখব অন্যরা কী দেখবে।

আর একদিন যাবে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থাকে —

যে নাচত, কারণ ছাড়া, মাঝরাতে, একা ঘরে — সে মরে গেছে? নাকি কোথাও আছে?

জানি না।

অস্তিত্ব আত্মঅনুসন্ধান আত্মপরিচয় দার্শনিক ভাবনা পরিচয় বাস্তবতা মনোবিজ্ঞান

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

টেবিল

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *