ঈদের দিন চাচার বাসায় গেলাম।
সবাই বসে আছে। চা-নাস্তা চলছে।
চাচাতো ভাই রাসেল বলল, “আমার ছেলে এবার আমেরিকায় চাকরি পেয়েছে।”
সবাই বলল, “বাহ!”
চাচি বললেন, “কত বেতন?”
“লাখ টাকার উপরে।”
সবাই আবার বলল, “বাহ!”
রাসেল ভাই আমার দিকে তাকাল।
“তুমি কী করছ এখন?”
“চাকরি করছি।”
“কোথায়?”
বললাম।
সে মাথা নাড়ল।
“ভালো ভালো।”
তারপর অন্য দিকে তাকাল।
বাড়ি ফেরার পথে হ্যাপি বলল, “তুমি চুপচাপ ছিলে কেন?”
“এমনি।”
“রাসেল ভাই যখন ছেলের কথা বলছিল, তোমার মুখ দেখে মনে হলো…”
“কী মনে হলো?”
“জানি না। অন্যরকম।”
চুপ করে রইলাম।
পরদিন অফিসে সাইফুল বলল, “তোর ছেলে কোন স্কুলে পড়ে?”
বললাম।
সে মাথা নাড়ল।
“ভালো স্কুল। খরচ তো অনেক?”
“মোটামুটি।”
“আমার ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে। মাসে চল্লিশ হাজার।”
“বাহ।”
“ভালো স্কুলে না পড়ালে ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ।”
বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখলাম পড়ছে।
ভাবলাম, ওর স্কুল কি যথেষ্ট ভালো?
শনিবার আরাশের স্কুলে অভিভাবক সভা।
একজন মা বললেন, “আমার মেয়ে এবার ক্লাসে ফার্স্ট।”
সবাই তাকালো।
“কীভাবে করলেন?”
“কোচিং। প্রাইভেট টিউটর। সারাদিন পড়াশোনা।”
মাথা নাড়লাম। ভাবলাম, আরাশকেও কি এত পড়াতে হবে?
বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “আরাশের জন্য আরেকজন টিউটর রাখা দরকার।”
“কেন?”
“অন্যরা রাখছে।”
সে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি তো বলতে, ওকে চাপ দিতে চাও না।”
চুপ করে রইলাম।
পরদিন পার্কে হাঁটতে গেলাম।
বেঞ্চে দুজন বসে কথা বলছে।
“নতুন গাড়ি কিনলেন?”
“হ্যাঁ।”
“কোনটা?”
একটা নাম বলল।
“বাহ! এখন তো আপনি সফল মানুষ।”
দুজনে হাসল।
আমি হাঁটতে থাকলাম।
ভাবলাম, আমার গাড়ি নেই। আমি কি অসফল?
বাড়ি ফিরে দেখি আরাশ খেলছে। লেগো দিয়ে কিছু বানাচ্ছে।
“কী বানাচ্ছ?”
“মহাকাশযান।”
“সুন্দর।”
সে হাসল।
“বাবা, আমি বড় হয়ে মহাকাশে যেতে চাই।”
“যাবে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
সে আবার বানাতে লাগল।
আমি ভাবলাম, রাসেল ভাইয়ের ছেলে আমেরিকায়। সে কি আরাশের চেয়ে বেশি সফল হবে?
তারপর ভাবলাম, আমি কেন তুলনা করছি?
রাতে মা ফোন করলেন।
“বাবা, তোর চাকরি কেমন চলছে?”
“ভালো।”
“পদোন্নতি হলো?”
“না।”
“কেন?”
“এমনি।”
মা চুপ করে রইলেন।
“তোর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে আমেরিকায়। শুনেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তুইও তো পারতিস।”
“কী পারতাম?”
“বিদেশে যেতে। বড় কিছু করতে।”
চুপ করে রইলাম।
“মা, আমি কি ছোট কিছু করছি?”
“না না, তা বলছি না। শুধু…”
“শুধু?”
“এমনি।”
ফোন রেখে বারান্দায় গেলাম।
হ্যাপি এলো।
“কী হলো?”
“কিছু না।”
“মা কী বলল?”
“এমনি।”
সে আমার পাশে দাঁড়াল।
“তুমি কি মনে করো তুমি সফল না?”
“জানি না।”
“কে ঠিক করে কে সফল?”
চুপ করে রইলাম।
পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে রিকশায় বসে আছি।
রিকশাওয়ালা বলল, “ভাই, আজ খুব গরম।”
“হ্যাঁ।”
“আপনি অফিস যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো চাকরি?”
“মোটামুটি।”
সে হাসল।
“আমার ছেলে পড়াশোনা করছে। বড় হয়ে সে অফিসে কাজ করবে।”
“ভালো।”
“আমি রিকশা চালাই। কিন্তু আমার ছেলে বড় হবে।”
তার দিকে তাকালাম। সে হাসছে। গর্বিত হাসি।
ভাবলাম, সে কি সফল?
অফিসে ঢুকে বুলবুল ভাইয়ের সাথে দেখা।
“কেমন আছ?”
“ভালো।”
“তোমার ছেলে কত বড় হলো?”
“পাঁচ।”
“পড়াশোনা কেমন?”
“ভালো।”
“কোন স্কুলে?”
বললাম।
তিনি মাথা নাড়লেন।
“ভালো ভালো।”
ঠিক রাসেল ভাইয়ের মতো।
বাড়ি ফিরে আরাশ দৌড়ে এলো।
“বাবা! আজ স্কুলে আমি ছবি এঁকেছি!”
“কী ছবি?”
“আমাদের পরিবার।”
ছবি দেখলাম। তিনটা মানুষ। হাত ধরা। হাসছে।
“এটা কে?”
“তুমি।”
“এটা?”
“মা।”
“আর এই ছোট্টটা?”
“আমি।”
ছবিটা হাতে নিলাম।
“সুন্দর।”
“টিচার বলেছে আমি ভালো আঁকি।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
সে দৌড়ে চলে গেল।
রাতে হ্যাপিকে ছবিটা দেখালাম।
“দেখো।”
সে দেখল।
“সুন্দর।”
“আরাশ ভালো আঁকে।”
“হ্যাঁ।”
চুপ করে বসে রইলাম।
“কী ভাবছ?”
“কিছু না।”
“বলো।”
“ভাবছি… আরাশ যদি বড় হয়ে শিল্পী হতে চায়?”
“হতে দেবে না?”
“দেব। কিন্তু…”
“কিন্তু?”
“লোকে কী বলবে?”
সে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি কি লোকের কথা ভাবো?”
চুপ করে রইলাম।
পরদিন সকালে আয়নায় তাকালাম।
শেভ করছি।
ভাবলাম, আমি কি সফল?
রাসেল ভাইয়ের মাপে—না।
মায়ের মাপে—হয়তো না।
সাইফুলের মাপে—জানি না।
আমার মাপে?
আমার মাপ কী?
আরাশ এলো।
“বাবা।”
“হুম।”
“তুমি কি খুশি?”
“কেন?”
“এমনি।”
“তুমি কি খুশি?”
সে হাসল।
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“তুমি আছ। মা আছে। লেগো আছে।”
সে চলে গেল।
আমি আয়নায় তাকিয়ে রইলাম।
বাইরে রিকশার ঘণ্টা। কেউ কোথাও যাচ্ছে।
ব্লেড তুললাম। শেভ করতে লাগলাম।
একটু ভাবনা রেখে যান