ব্লগ

যেখানে হারিয়ে গেল সহজ কথোপকথন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ যখন তিন বছর বয়সী ছিল, আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম।

“বাবা, চাঁদ কেন উঠে?”

“কারণ রাত হয়েছে।”

“রাত কেন হয়?”

“কারণ সূর্য ঘুমিয়ে গেছে।”

“সূর্য কেন ঘুমায়?”

এভাবে একটার পর একটা প্রশ্ন। আমি উত্তর দিতাম। আরাশ খুশি হতো।

এখন আরাশের এগারো বছর। আমরা কথা বলি। কিন্তু সেই সহজ কথোপকথন নেই।

“আরাশ, আজ স্কুলে কী হয়েছিল?”

“কিছু না।”

“ক্লাসে কী পড়েছ?”

“এই-সেই।”

“বন্ধুদের সাথে খেলেছিস?”

“হুম।”

আরাশের উত্তর এখন এক-দুই শব্দে। আমার প্রশ্ন আর তার কৌতূহল জাগায় না।

আমি ভাবি, কোথায় হারিয়ে গেল সেই বকবকানি?

হয়তো আরাশ বড় হয়ে গেছে। তার নিজস্ব জগত তৈরি হয়েছে। আমার সাথে সব কথা শেয়ার করার দরকার বোধ করে না।

কিন্তু আমার খারাপ লাগে।

আমি চাই আরাশ আমার কাছে তার মনের কথা বলুক। তার স্বপ্নের কথা বলুক। তার সমস্যার কথা বলুক।

কিন্তু সে বলে না।

আমি নিজেও হয়তো দায়ী। আমি তার সাথে সহজ কথা বলি না। সবসময় উপদেশ দিই।

“আরাশ, পড়াশোনা কর।”

“আরাশ, খেলা কম কর।”

“আরাশ, টিভি কম দেখ।”

এই উপদেশগুলো আমাদের কথোপকথনকে ভারী করে ফেলেছে।

আরাশ আমার সাথে কথা বলতে চায় না। কারণ সে জানে আমি তাকে বকবো।

আমার বাবার সাথেও আমার এমনই সম্পর্ক ছিল। তিনি বলতেন, আমি শুনতাম। কোনো আড্ডা ছিল না।

আমিও সেই পথে চলেছি।

একদিন আমি আরাশকে বলি, “আরাশ, তুই কী হতে চাস?”

“জানি না।”

“ভাব না?”

“ভাবি। কিন্তু তোমাকে বলব কেন? তুমি তো বলবে এইটা ভুল, ওইটা ভুল।”

আরাশের এই কথায় আমি থমকে যাই।

সে ঠিক বলেছে। আমি তার স্বপ্নের সমালোচনা করি। তার পছন্দের বিরোধিতা করি।

“আরাশ, আমি তোর কথা শুনতে চাই। কোনো বিচার করব না।”

আরাশ সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকায়।

“সত্যি বাবা?”

“সত্যি।”

আরাশ একটু ভেবে বলে, “আমি আর্টিস্ট হতে চাই।”

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়, “আর্টিস্ট হয়ে কী করবি? টাকা-পয়সা হবে না।”

কিন্তু আমি থেমে যাই।

“বাহ। খুব ভালো।”

আরাশ অবাক।

“তুমি রাগ করলে না?”

“না। তোর পছন্দ তোর।”

আরাশের মুখে হাসি।

সেদিন আমরা অনেক কথা বলি। সেই ছোটবেলার মতো।

আমি বুঝি, সন্তানের সাথে সহজ সম্পর্ক রাখতে হলে বিচার করা বন্ধ করতে হবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *