দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার। দেয়ালে সাদা ঘড়ি। লাল সেকেন্ডের কাঁটা।
২টা ১৫।
২টা ১৬।
২টা ১৬।
২টা ১৬।
কাঁটা নড়ছে না। নাকি আমি ঠিক দেখতে পারছি না?
পাশের চেয়ারে বসা মানুষটি দ্রুত ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে। শব্দ হচ্ছে না। সবকিছু যেন কোনো ঘন তরলের নিচে ডুবে আছে।
২টা ১৭।
পনেরো মিনিট পর বের হলাম। মনে হলো এক ঘণ্টা।
ঘরে ফিরে কথাটা বলতেই উত্তর এল, “আসলে তুমি ভয় পাও, তাই সময় কাটছে না।”
ভয়?
হয়তো। যখন প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলি, তিন ঘণ্টা কাটত তিন মিনিটে।
সেটা কি সাহস ছিল?
সন্তানকে একদিন বললাম, “ঘড়ি দেখ। এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড করে যায়।”
সে প্রশ্ন করল, “খেলার সময় কেন তাড়াতাড়ি যায়?”
“জানি না।”
সে আবার জিজ্ঞেস করল, “ঘড়ি কি মিথ্যা বলে?”
আমি উত্তর দিলাম না।
সত্যিই তো, ঘড়ি কার? যে বানাচ্ছে তার? নাকি যে দেখছে তার?
হাসপাতালের করিডোরে সবুজ ডিজিটাল ঘড়ি।
৮:৩০।
৮:৩১।
৮:顺১।
৮:৩১।
সংখ্যাগুলো পাল্টাতে ভুলে গেছে।
পাশে বসা মানুষটি জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ হলো?”
বললাম, “দশ মিনিট।”
সে ঘড়ি দেখাল। এক ঘণ্টা পার হয়েছে।
আমি ঘড়ির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। যান্ত্রিক সত্যের চেয়ে বড় কোনো মিথ্যা আর নেই।
এক বন্ধু বলত, তার অফিসের আট ঘণ্টা মনে হয় এক সপ্তাহ।
ছুটির দিনে সে নদীতে যায়। মাছ ধরে। রোদ ওঠে। ফিরে আসে।
সে বলে, “মাছ ধরার সময় সময় থাকে না।”
আমি লিখতে বসি। বিকেল চারটে।
যখন চোখ তুলি, জানালা দিয়ে অন্ধকার। রাত দশটা।
ছয় ঘণ্টা হাওয়া।
মাথা ঘোরে। পানি খাই।
জিজ্ঞেস করা হলো, “খেয়েছ?”
আমি মনে করতে পারি না। দুপুরের খাবারের স্বাদ জিভে নেই। স্মৃতির পকেটে একটা বড় ফুটো। সব গলে পড়ে যাচ্ছে।
২০২২ সালে চাকরিটা ছাড়লাম।
সবাই বলল, “ভালো চাকরি, থেকে যাও।”
আমি বললাম, “আমি তো মারা যাচ্ছি।”
অফিসের আট ঘণ্টা ছিল আটটা জন্মের সমান। প্রতিটি সেকেন্ড কাঁটার ওপর দিয়ে হাঁটা।
বাড়ি ফিরতাম। যখন জিজ্ঞেস করা হতো দিনটা কেমন ছিল, বলতাম—”লম্বা।”
সঙ্গী একদিন বলল, “ছেড়ে দাও। তুমি তো আর বাঁচতে পারছ না।”
বাঁচতে না পারা।
পরদিন ইস্তফা দিলাম।
মা মারা যাওয়ার পরের এক মাস।
সেই মাসটা ক্যালেন্ডারে ছিল না। দিন আর রাত আলাদা করা যাচ্ছিল না।
সব ধূসর।
খাবার দিলে খেতাম। ঘুমের কথা বললে চোখ বুজতাম।
সময় তখন চলছিল না। সময় তখন স্থির হয়ে ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মতো। আমি তাতে ভাসছিলাম।
একদিন সকালে জানালার গ্রিলে রোদ পড়ল। একটা পাখি ডাকল।
মনে হলো, সমুদ্র শুকিয়ে গেছে। আবার ঘড়ির টিকটিক শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু ওই এক মাস? ওটা কোথায় গেল?
সন্তান স্কুল থেকে ফিরে বলল, “শিক্ষক বলেছে এক ঘণ্টা মানে ষাট মিনিট।”
আমি বললাম, “উনি ঠিক বলেছেন।”
“কিন্তু আমার তো মনে হয় না।”
“তোমার মনও ঠিক বলেছে।”
সে বলল, “দুটো আলাদা জিনিস কীভাবে ঠিক হয়?”
আমি বললাম, “আলাদা বলেই তো তারা সত্য।”
দুটো সময়। একটা ঘড়ির—যা সবার। একটা মনের—যা শুধু নিজের।
কোনটায় আমরা সত্যিই বাঁচি?
ছোটবেলায় বাবার পাশে বসে থাকতাম। তিনি বই পড়তেন। আমি চুপ।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সেই সময়গুলো ছোট ছিল না বড় ছিল, জানি না।
শুধু জানি, সেগুলো আমার ছিল।
এখন সন্তানের সাথে বসি। ঘুমের গল্প বলি।
ঘড়ি দেখি না। সময় উড়ে যায়। কিন্তু ভেতরে কিছু একটা জমা হয়।
যেটা ঘড়িতে মাপা যায় না, তাকেই জীবন বলে ভুল করি আমরা।
ঘর থেকে প্রশ্ন আসে, “তুমি সময় নিয়ে এত ভাবো কেন?”
বলি, “কারণ সময় আসলে নেই।”
সবাই হাসে। বোঝে না।
আমিও কি বুঝি?
সময় আর মানুষ একসাথে চলে না। কখনো সে আগে, আমরা পিছে। কখনো আমরা আগে, সে ঠায় দাঁড়িয়ে।
রাতে শুয়ে শুনি ঘড়ির টিকটিক।
কিন্তু অনুভব করি পাশের মানুষের নিঃশ্বাস। নিজের হৃৎপিণ্ড।
ঘড়ি বলছে সময় যাচ্ছে।
নিঃশ্বাস বলছে সময় আসছে।
আমি নিঃশ্বাসের দিকেই কান পেতে রাখি।
একটু ভাবনা রেখে যান