আজ জন্মদিন। ৩৯ বছর।
হ্যাপি কেক কিনে এনেছে। আরাশ মোমবাতি জ্ালাচ্ছে।
“আব্বু, ইচ্ছা করো।”
কী ইচ্ছা করব? জানি না।
মোমবাতি নিভিয়ে দিলাম।
“কী চেয়েছ?” আরাশ জিজ্ঞেস করল।
“বলা যায় না। তাহলে পূরণ হয় না।”
আরাশ হাসল। কেক খেল। হ্যাপি চা দিল।
“কেমন লাগছে?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।
“কী?”
“৩৯ হলে।”
“জানি না। ৩৮ থেকে আলাদা না।”
“গত বছর যেন কাল ছিল।”
ঠিক কথা। গত জন্মদিন মনে আছে। কেক খেয়েছিলাম। আরাশ গান গেয়েছিল। এক বছর কোথায় গেল?
রাতে ঘুমাতে পারলাম না। উঠে জানালায় দাঁড়ালাম। রাস্তায় গাড়ি নেই। নিস্তব্ধ।
মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। গ্রীষ্মের ছুটি। জুন থেকে আগস্ট। তিন মাস। কত লম্বা ছিল।
দুপুরে মাটিতে শুয়ে থাকতাম। গরম। ঘাম হচ্ছে। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করত না। সময় যেন থেমে ছিল।
এখন? জানুয়ারি আসে। চোখ খুলি। ডিসেম্বর।
হ্যাপি ঘুম থেকে উঠল। “কী হয়েছে?”
“ঘুম আসছে না।”
“চল, শুয়ে পড়ো।”
শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু ঘুম নেই।
পরদিন সকালে বাবু ফোন করল। মামাতো ভাই। কথা হয় না মাসের পর মাস। আজ হঠাৎ ফোন।
“কী খবর?”
“ভালো। তুই?”
“তোর জন্মদিন ছিল না কাল?”
“ছিল।”
“কত হলো?”
“৩৯।”
“শালা, বুড়া হয়ে গেছিস।”
হাসলাম। “তুই তো আরো বুড়া।”
“চার মাসের ব্যবধান। ভুলে গেছিস?”
ভুলিনি। বাবুর জন্মদিন জুলাইয়ে। আমার নভেম্বরে।
“মনে আছে ছোটবেলায় আমরা নানুবাড়িতে যেতাম?” বাবু বলল।
“হ্যাঁ।”
“পুকুরে সাঁতার কাটতাম। তুই পারতি না। পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতি।”
এখনো পারি না। কখনো শিখিনি।
“মনে আছে সেই আমগাছ?” বাবু বলল।
মনে আছে। বিশাল গাছ। ওপরে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম।
“সেই গাছ এখন নেই।” বাবু বলল।
“কেন?”
“ঝড়ে ভেঙে গেছে। তিন বছর হয়ে গেল।”
তিন বছর? মনে নেই কখন শুনেছিলাম।
ফোন রাখলাম। হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কে ছিল?”
“বাবু।”
“কী বলছিল?”
“ছোটবেলার কথা।”
শুক্রবার বিকেলে আরাশকে নিয়ে পার্কে গেলাম। আরাশ দৌড়ে গেল। আমি বেঞ্চে বসলাম।
ফোন বের করলাম। অফিসের চিঠি পড়ছি। আরাশ চিৎকার করল।
“আব্বু! দেখো!”
তাকালাম। কী দেখাচ্ছে?
“ওই পিঁপড়াটা!”
একটা পিঁপড়া। পাতার টুকরো টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
“হুম।”
“আব্বু, ওটা কত ভারী হবে?”
“জানি না।”
“পিঁপড়ার চেয়ে বড় তো!”
ঠিক কথা।
আরাশ আবার দৌড়ে গেল। প্রজাপতি দেখে চিৎকার করছে। তারপর কুকুর দেখছে। তারপর ফোয়ারার পানি দেখছে।
আমি বসে আছি। ঘড়ি দেখলাম। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এক ঘণ্টা কীভাবে গেল?
আরাশ এল। ঘাম হয়েছে। হাসছে।
“আব্বু, কত মজা!”
“কী মজা?”
“সব কিছু!”
সব কিছু।
বাসায় ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন ছিল?”
“ভালো।”
“আরাশ কী করছিল?”
“পিঁপড়া দেখছিল। প্রজাপতি দেখছিল।”
“তুমি?”
“বসে ছিলাম।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আরাশের সাথে খেলোনি?”
“না।”
“কেন?”
কেন? জানি না।
“ক্লান্ত ছিলাম।”
মিথ্যা কথা। ক্লান্ত ছিলাম না। শুধু বসে ছিলাম।
রাতে আরাশ বলল, “আব্বু, তুমি কি আমার বয়সের কথা মনে করো?”
“হ্যাঁ। কেন?”
“তখন কেমন ছিল?”
কেমন ছিল? অনেক দিন আগের কথা। কিন্তু মনে হয় কাল ছিল।
“ভালো ছিল।”
“আমার মতো খেলতে?”
“হ্যাঁ।”
“কী খেলতে?”
মনে করার চেষ্টা করলাম। কী খেলতাম? মার্বেল? গোল্লাছুট? গাছে ওঠা?
“অনেক কিছু।”
“এখন খেলো না কেন?”
ভালো প্রশ্ন। কেন খেলি না?
“বড় হয়ে গেছি।”
“বড়রা খেলে না?”
“কম খেলে।”
“কেন?”
“জানি না আরাশ।”
আরাশ চলে গেল ঘুমাতে। আমি জানালায় তাকালাম।
ছয় বছর বয়সে প্রতিদিন আলাদা ছিল। স্কুলের পথে নতুন কিছু দেখতাম। ক্লাসে নতুন কিছু শিখতাম। বাসায় ফিরে নতুন খেলা খেলতাম।
এখন? প্রতিদিন একই। উঠি। অফিস। কাজ। বাসা। খাওয়া। ঘুম।
হ্যাপি এসে পাশে দাঁড়াল। “কী ভাবছ?”
“সময়ের কথা।”
“কী হয়েছে সময়ের?”
“দ্রুত যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ।”
“আরাশ যখন জন্মেছিল, মনে আছে?”
“হ্যাঁ। মনে হয় গতকাল।”
“সাত বছর হয়ে গেল।”
“হ্যাঁ।”
আমরা দুজনে চুপ করে রইলাম।
হ্যাপি বলল, “তুমি জানো, গত মাসে তোমার সাথে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
“কী?”
“ভুলে গেছি।”
“কীভাবে ভুলে গেলে?”
“জানি না। মনে হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখন মনেই নেই।”
আমিও অনেক কিছু ভুলে যাই। গতকাল কী করেছি? সপ্তাহখানেক আগে? মনে নেই। সব মিশে গেছে।
কিন্তু আমগাছে বসে থাকার কথা মনে আছে। বিশ বছর আগের ঘটনা। মনে হয় সেদিন ছিল।
“হ্যাপি, তুমি কি মনে করো সময় আগে ধীরে যেত?”
“ছোটবেলায়?”
“হ্যাঁ।”
“হ্যাঁ। গ্রীষ্মের ছুটি মনে হত শেষ হবে না।”
“এখন?”
“এখন শুক্রবার এলে রবিবার চলে যায়।”
ঠিক।
পরের সপ্তাহে সাইফুলের সাথে দেখা। কফি খেতে বসলাম।
“কেমন আছিস?” সাইফুল জিজ্ঞেস করল।
“ভালো। তুই?”
“চলছে। মনে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা এই জায়গায় আড্ডা দিতাম?”
মনে আছে। এই একই কফি শপ। টেবিল বদলেছে। চেয়ার বদলেছে। কিন্তু জায়গা একই।
“কত বছর হলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“পনের? ষোল?”
“১৭।”
“শালা, সময় কেমন উড়ে যায়।”
আমরা চুপ করে কফি খেলাম।
সাইফুল বলল, “তুই জানিস, আমি প্রতিদিন একই রাস্তায় অফিস যাই। সাত বছর ধরে। একই রাস্তা।”
“হুম।”
“কিন্তু রাস্তাটা মনে নেই।”
“মানে?”
“মানে কী আছে সেই রাস্তায়, কী নেই, তা খেয়াল করি না। শুধু যাই। কীভাবে পৌঁছাই জানি না।”
আমিও তাই। প্রতিদিন একই রাস্তা। কিন্তু দেখি না।
“আচ্ছা সাইফুল, তুই কি মনে করিস আমরা বদলে গেছি?”
“কীভাবে?”
“ছোটবেলায় সব কিছু দেখতাম। এখন দেখি না।”
সাইফুল চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না ভাই। হয়তো। হয়তো না।”
বাসায় ফিরে আরাশকে দেখলাম। মেঝেতে শুয়ে আছে। ছবি আঁকছে।
“কী আঁকছিস?”
“পাখি।”
পাখিটা দেখতে মাছের মতো। কিন্তু বললাম, “সুন্দর।”
“আব্বু, তুমি ছবি আঁকো?”
“আগে আঁকতাম।”
“এখন কেন আঁকো না?”
“ভুলে গেছি।”
“ভুলে যায় কীভাবে?”
জানি না। কীভাবে ভুলে যায়?
“আঁকো না আর।” আরাশ বলল। “আমি শেখাব।”
আমি মেঝেতে বসলাম। আরাশ কলম দিল।
“আঁকো।”
কী আঁকব? মনে নেই কীভাবে আঁকতে হয়।
একটা লাইন টানলাম। আরেকটা লাইন।
আরাশ বলল, “এটা কী?”
“জানি না। তুই বল।”
“গাছ?”
“হ্যাঁ, গাছ।”
আরাশ হাসল। “আব্বু, তুমি আঁকতে পারো না।”
“পারি না।”
“কিন্তু চেষ্টা করেছ।”
হ্যাঁ। চেষ্টা করেছি।
রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “আজ কেমন ছিল?”
“স্বাভাবিক।”
“মানে?”
“মানে একই। প্রতিদিনের মতো।”
“কিন্তু তুমি তো আরাশের সাথে ছবি এঁকেছ।”
“হ্যাঁ।”
“সেটা তো আলাদা।”
ঠিক। সেটা আলাদা ছিল।
“তুমি ঠিক বলেছ।”
হ্যাপি শুয়ে পড়ল। আমি জানালায় তাকালাম।
হয়তো প্রতিদিন আলাদা। কিন্তু আমি দেখি না। হয়তো দেখি। কিন্তু মনে রাখি না।
হয়তো সময় দ্রুত যাচ্ছে। হয়তো আমি শুধু খেয়াল করছি না।
জানি না।
ঘড়ি দেখলাম। রাত ১২টা। আরেকটা দিন শেষ। আরেকটা শুরু হলো।
কাল কী হবে? জানি না। হয়তো একই। হয়তো আলাদা।
হয়তো আমি পিঁপড়া দেখব। হয়তো দেখব না।
হয়তো আরাশের সাথে খেলব। হয়তো শুধু দেখব।
হয়তো সময় ধরে রাখব। হয়তো হাতছাড়া করব।
জানি না।
চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম এল না। চোখ খুললাম। অন্ধকার।
হয়তো ৩৯ বছর দ্রুত গেছে। হয়তো ধীরে। মনে নেই।
আগামী ৩৯? জানি না।
জানালা দিয়ে আকাশ দেখলাম। তারা নেই। মেঘ ঢেকে রেখেছে।
কাল হয়তো তারা দেখব। হয়তো না।
জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান