ভোর ছয়টা। ঘুম ভাঙল।
বিছানায় শুয়ে আছি। কিন্তু মনে হচ্ছে দেরি হয়ে গেছে।
কিসের দেরি?
জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে দেরি।
উঠে পড়লাম।
ক্যালেন্ডারে তাকালাম। আজকের তারিখে লেখা:
১০টা – প্রেজেন্টেশন ১টা – রিপোর্ট জমা ৩টা – মিটিং
দেখেই বুকটা চেপে এল।
কেন?
এগুলো তো প্রতিদিনই থাকে। কিন্তু প্রতিদিনই বুকটা চেপে আসে।
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজেকে বললাম, “আজই সব শেষ করতে হবে।”
কিন্তু এই কথাটা কি আমি বলছি?
নাকি অন্য কেউ? যে আমার মুখ দিয়ে বলছে?
জানি না।
অফিসে পৌঁছলাম। ডেস্কে তাকালাম।
কাগজের স্তূপ। কম্পিউটার। ফাইল।
বসলাম। কাজ শুরু করলাম।
কিন্তু মনে হচ্ছে আমি নেই। আমার একটা অংশ কাজ করছে। আরেকটা অংশ দেখছে।
এবং যে অংশটা দেখছে, সে জিজ্ঞেস করছে, “কেন করছো এসব?”
উত্তর দিতে পারছি না।
প্রেজেন্টেশনের জন্য তথ্য লাগবে। অন্য একজনের কাছে আছে।
এখনো আসেনি।
অপেক্ষা করছি।
পা কাঁপছে। নিজে নিজে।
হাত টেবিলে টোকা মারছে। নিজে নিজে।
কেন?
তাড়া। তাড়া আছে।
কিসের তাড়া?
জানি না। কিন্তু আছে।
সহকর্মী এসেছে। তথ্য দিয়েছে।
প্রেজেন্টেশন করলাম। শেষ করলাম।
ভালো লাগল?
না। শুধু মনে হলো, একটা কাজ শেষ। আরেকটা বাকি।
দুপুর একটা। রিপোর্ট জমা দিতে গেলাম।
দেখলাম একটা পাতা প্রিন্ট হয়নি।
ফিরে এলাম। প্রিন্ট করলাম। দৌড়ে গেলাম।
জমা দিলাম।
বুকের ভেতর একটা চিৎকার। শুনতে পারছি।
চিৎকার বলছে, “এটা কি জীবন?”
কিন্তু সেই চিৎকার ডুবে যাচ্ছে। অন্য একটা শব্দে।
সেই শব্দ বলছে, “তাড়াতাড়ি। পরের কাজ।”
তিনটা। মিটিং।
বসে আছি। কথা শুনছি। কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছে না।
শুধু ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি।
কখন শেষ হবে?
পাঁচটা। মিটিং শেষ।
মনে পড়ল, বন্ধুর জন্মদিন। উপহার কিনতে হবে।
দোকানে গেলাম।
দরজা বন্ধ।
দেখলাম সাইনবোর্ড। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বন্ধ।
এখন সাতটা।
ভুলে গেছি। শুক্রবার তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়।
এত সাধারণ জিনিস। এত পরিচিত।
কিন্তু ভুলে গেছি।
কারণ মাথায় ছিল শুধু তাড়া। তাড়া। তাড়া।
বাসে বসলাম। জানালা দিয়ে তাকালাম।
একটা মেয়ে হাঁটছে। মায়ের হাত ধরে।
ধীরে ধীরে হাঁটছে। কোনো তাড়া নেই।
মেয়েটা থামল। একটা ফুল দেখছে।
মা দাঁড়িয়ে রইল। হাসছে।
মেয়েটা আবার হাঁটতে শুরু করল।
আমি দেখলাম। শুধু দেখলাম।
কিছু একটা ভেঙে গেল ভেতরে।
কী ভাঙল?
জানি না। কিন্তু ভাঙল।
এবং ভাঙার সাথে সাথে মনে হলো, আমি কোথায় হারিয়ে গেছি।
বাড়ি ফিরলাম। হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন ছিল দিনটা?”
“ব্যস্ত।”
“সবসময় ব্যস্ত।”
“জানি।”
হ্যাপি আর কিছু বলল না।
আরাশ এসে বলল, “আব্বু, খেলবে?”
“এখন না। ক্লান্ত।”
আরাশ চলে গেল।
আমি বসে রইলাম।
ভাবলাম, কী করলাম আজ?
প্রেজেন্টেশন। রিপোর্ট। মিটিং।
এগুলো কি জরুরি ছিল?
হ্যাঁ। সবাই বলে জরুরি।
কিন্তু আসলেই জরুরি?
একদিন পরে হলে কি পৃথিবী থেমে যেত?
না।
তাহলে এত তাড়া কেন?
জানি না।
মা বললেন, “কাল ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। সাথে যাবে?”
“যাব।”
পরদিন গেলাম। অপেক্ষা করছি ডাক্তারের চেম্বারে।
মায়ের হাত ধরলাম। হঠাৎ।
মা তাকালেন। “কী হয়েছে?”
“কিছু না। শুধু… এই মুহূর্তটা ভালো লাগছে।”
মা হাসলেন। কিছু বললেন না।
কিন্তু হাতটা চেপে ধরলেন।
রাতে শুয়ে ভাবলাম।
আজকের দিনটা। কাল করেছি?
ডাক্তারের চেম্বারে বসে ছিলাম। মায়ের হাত ধরে।
এটুকু মনে আছে।
বাকি সব?
মনে নেই।
হয়তো কাজ করেছি। হয়তো তাড়া ছিল।
কিন্তু মনে নেই।
শুধু মনে আছে মায়ের হাত। উষ্ণ। নরম।
আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “তুমি সবসময় এত তাড়ায় থাকো কেন?”
“কাজ আছে।”
“কাজ শেষ হয় না?”
“হয়। কিন্তু আবার নতুন কাজ আসে।”
আরাশ বলল, “তাহলে তো কখনো শেষ হবে না।”
“হবে না।”
আরাশ বলল, “তাহলে তাড়া কেন? তাড়া করলেও তো শেষ হবে না।”
থেমে গেলাম।
আরাশ ঠিক বলেছে। শেষ হবে না।
তাহলে তাড়া কেন?
আরাশ বলল, “আমি তাড়া করি না। খেলি। শেষ হয় না। কিন্তু ভালো লাগে।”
চলে গেল খেলতে।
আমি বসে রইলাম।
তাড়া করি কেন?
কারণ মনে হয় দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কিসের দেরি?
জানি না।
কিন্তু ভয় আছে। দেরি হলে হারিয়ে যাবে কিছু।
কী হারিয়ে যাবে?
জানি না।
হয়তো কিছুই না।
কিন্তু ভয় আছে।
এবং সেই ভয়ে তাড়া করছি। প্রতিদিন।
এবং তাড়া করতে করতে আসলে হারিয়ে ফেলছি।
কী?
এই মুহূর্ত। এই নিঃশ্বাস। এই জীবন।
সাইফুল বলল, “তুই সবসময় দৌড়াচ্ছিস। কোথায় যাচ্ছিস?”
“জানি না। কাজ আছে।”
“কাজ সবসময় থাকবে। তুই কি সবসময় দৌড়াবি?”
“হয়তো।”
সাইফুল বলল, “আমিও দৌড়াতাম। এখন থেমে গেছি।”
“কেন?”
“কারণ বুঝেছি, যেখানে যাচ্ছিলাম সেখানে পৌঁছানোর পর আবার দৌড়াতে হবে। তাহলে এখন থামলেই ভালো।”
“থেমে কী করছিস?”
“বাঁচছি।”
আমি কিছু বললাম না।
বাঁচছি। সাইফুল বলল বাঁচছি।
আমি কী করছি?
দৌড়াচ্ছি। কিন্তু বাঁচছি?
জানি না।
হয়তো বাঁচছি না। শুধু কাজ করছি।
এবং কাজ আর বাঁচা কি একই?
না।
হ্যাপি বলল, “তুমি জানো, তোমার প্রেজেন্টেশন এক সপ্তাহ পরে হলেও কিছু হতো না।”
“হতো। বস রাগ করত।”
“রাগ করুক। কিন্তু তুমি তো এখন মরে যাচ্ছো তাড়ায়।”
“মরছি না।”
হ্যাপি বলল, “মরছো। ধীরে ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু করে। এই তাড়া তোমাকে খেয়ে ফেলছে।”
চুপ করে রইলাম।
হ্যাপি ঠিক বলছে।
তাড়া আমাকে খেয়ে ফেলছে। প্রতিদিন।
সকাল থেকে রাত। তাড়া।
এবং সেই তাড়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আমি।
যে আমি হ্যাপির সাথে বসে চা খেতে চায়।
যে আমি আরাশের সাথে খেলতে চায়।
যে আমি শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে চায়।
সেই আমি হারিয়ে যাচ্ছে।
থাকছে শুধু একটা যন্ত্র। যে কাজ করে। প্রেজেন্টেশন করে। রিপোর্ট লেখে। মিটিং করে।
এবং ভাবে এটাই জীবন।
কিন্তু এটা কি জীবন?
জানি না।
একদিন অফিসে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো, এই কাজটা না করলে কী হবে?
কিছু হবে না।
কাল আবার একটা কাজ আসবে। সেটা করতে হবে।
পরশু আরেকটা।
এভাবে চলবে।
যতদিন না আমি থেমে যাই।
এবং থেমে গেলে?
তখন অন্য কেউ করবে। এই কাজ।
এবং কেউ মনে রাখবে না আমি কী করেছি।
মনে রাখবে না প্রেজেন্টেশন। রিপোর্ট। মিটিং।
তাহলে এত তাড়া কেন?
উত্তর নেই।
রাতে মা ফোন করলেন। “আজ আসবি?”
“আজ না মা। কাজ আছে।”
“সবসময় কাজ।”
“জানি। কিন্তু আজ জরুরি।”
মা চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে। যখন সময় হবে আসবি।”
ফোন রাখলাম।
ভাবলাম, সময় কখন হবে?
কাজ তো সবসময় থাকবে।
তাহলে সময় কখনো হবে না।
এবং একদিন মা থাকবেন না।
তখন বুঝব, কাজের চেয়ে মায়ের সাথে বসে থাকা বেশি জরুরি ছিল।
কিন্তু তখন দেরি হয়ে যাবে।
এবং সেই দেরি আর পূরণ হবে না।
আরাশ বলল, “তুমি কখন আমার সাথে খেলবে?”
“শিগগিরই।”
“শিগগির কখন?”
“শিগগির মানে… শিগগির।”
আরাশ বলল, “গতকালও বলেছিলে শিগগির। কিন্তু খেলোনি।”
“কাজ ছিল।”
আরাশ বলল, “সবসময় কাজ। আমার সাথে খেলা কি কাজ না?”
থেমে গেলাম।
খেলা কি কাজ?
আরাশের কাছে হ্যাঁ। আমার কাছে না।
কিন্তু কোনটা বেশি জরুরি?
অফিসের প্রেজেন্টেশন, নাকি আরাশের সাথে খেলা?
এখন মনে হয় প্রেজেন্টেশন।
কিন্তু দশ বছর পর?
তখন মনে হবে খেলা।
কিন্তু তখন আরাশ আর খেলবে না। বড় হয়ে যাবে।
এবং সেই সময় হারিয়ে যাবে।
যে সময় ফিরবে না।
হ্যাপি বলল, “তোমার কি মনে আছে আমরা কবে শেষ একসাথে বসে গল্প করেছিলাম?”
ভাবলাম। মনে নেই।
বললাম, “জানি না। হয়তো গত সপ্তাহে।”
হ্যাপি বলল, “গত মাসে। এক মাস হয়ে গেছে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। তুমি সবসময় ব্যস্ত। কাজ নিয়ে। তাড়ায়।”
“জানি। কিন্তু এখন অনেক কাজ।”
হ্যাপি বলল, “কাজ সবসময় থাকবে। কিন্তু আমি? আমি কি সবসময় থাকব?”
চুপ করে রইলাম।
হ্যাপি ঠিক বলছে।
কাজ থাকবে। কিন্তু হ্যাপি?
একদিন থাকবে না।
এবং তখন কাজ করে কী হবে?
কার জন্য?
রাতে শুয়ে ভাবলাম।
আমি কী করছি?
তাড়া করছি। কিন্তু কিসের জন্য?
যেন সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। এবং আমাকে সব শেষ করতে হবে।
কিন্তু সব কখনো শেষ হয় না।
কাজ শেষ করলে আরেকটা আসে।
তাড়া শেষ হয় না।
এবং তাড়া করতে করতে যা হারাচ্ছি, সেটা আর ফিরে পাব না।
মায়ের সাথে বসে থাকা।
আরাশের সাথে খেলা।
হ্যাপির সাথে গল্প।
এগুলো ফিরবে না।
কারণ সময় এগিয়ে যাচ্ছে। এবং আমি তাড়ায় আছি।
পরদিন সকালে উঠে ক্যালেন্ডার দেখলাম।
আজ আবার প্রেজেন্টেশন। রিপোর্ট। মিটিং।
তাড়া শুরু হবে।
কিন্তু এবার একটা প্রশ্ন মনে এল।
এই তাড়া কি আমি চাই?
নাকি অন্য কেউ চাপিয়ে দিয়েছে?
জানি না।
কিন্তু জানি, এই তাড়ায় আমি হারিয়ে যাচ্ছি।
এবং যা হারাচ্ছি, সেটা আর পাব না।
অফিসে গেলাম। কাজ শুরু করলাম।
কিন্তু মাঝে মাঝে থামলাম। শুধু বসে রইলাম।
কিছু না করে।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“কিছু না। শুধু ভাবছিলাম।”
“কী ভাবছিলে?”
বললাম, “এই কাজ কি সত্যিই জরুরি?”
সহকর্মী হেসে বলল, “অবশ্যই। বস বলেছেন আজই শেষ করতে হবে।”
“কিন্তু কাল করলে কী হবে?”
সহকর্মী থেমে গেল। তারপর বলল, “জানি না। হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু আমরা তো এভাবেই করি।”
এভাবেই করি।
হ্যাঁ। এভাবেই করি।
তাড়া করি। কারণ সবাই করে।
কিন্তু কেন করে?
জানে না কেউ।
শুধু করে। কারণ এভাবেই করতে হয়।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম। আরাশ বলল, “খেলবে?”
ভাবলাম। কাজ আছে। বাসায় এনেছি।
কিন্তু থামলাম।
বললাম, “হ্যাঁ। খেলব।”
আরাশ অবাক হলো। “সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
খেললাম। কতক্ষণ জানি না।
কিন্তু ভালো লাগল।
এবং সেই সময় কাজের কথা মনে পড়েনি।
তাড়ার কথা মনে পড়েনি।
শুধু ছিল আরাশ। খেলা। হাসি।
রাতে হ্যাপি বলল, “আজ তুমি অন্যরকম।”
“কেমন?”
“শান্ত। যেন তাড়া নেই।”
হাসলাম। “তাড়া তো আছে। কিন্তু আজ থামলাম।”
হ্যাপি বলল, “ভালো লাগছে দেখতে।”
আমিও ভালো লাগছে।
কিন্তু জানি, কাল আবার শুরু হবে।
তাড়া। কাজ। প্রেজেন্টেশন।
এবং আবার হারিয়ে যাব।
কিন্তু অন্তত আজ ছিলাম।
এখানে। আরাশের সাথে। হ্যাপির সাথে।
এবং এই আজ হয়তো মনে থাকবে।
যখন বাকি দিনগুলো ভুলে যাব।
কারণ বাকি দিনগুলো শুধু তাড়া।
কিন্তু আজ ছিল জীবন।
এবং জীবন আর তাড়া এক নয়।
হয়তো কখনো ছিল না।
শুধু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম।
তাড়ায়।
একটু ভাবনা রেখে যান