আজ সকালে পার্কে দেখি একটা শিশু বালি দিয়ে দুর্গ বানাচ্ছে। খুব মনোযোগ দিয়ে, এক এক করে দেয়াল তুলছে। তার চোখে সৃষ্টির নেশা – যেন সে একটা রাজ্য গড়ছে। কিন্তু হঠাৎ আরেকটা বাচ্চা এসে লাথি মেরে সব ভেঙে দিল। প্রথম বাচ্চাটি কেঁদে ফেলল। “আমার দুর্গ!” আমি ভাবলাম – এই তো আমাদের সব সৃষ্টির গল্প। আমরা গড়ি, আর ভয় পাই ভেঙে যাওয়ার।
রাস্তায় দেখি একজন রিকশা আর্টিস্ট তার রিকশায় পাখির ছবি আঁকছেন। তার হাতের তুলি যেন জাদুর কাঠি। প্রতিটা রঙে প্রাণ আছে, প্রতিটা রেখায় স্বপ্ন আছে। কিন্তু পুলিশ এসে বলল, “এখানে রাখা যাবে না।” শিল্পীর মুখে যে হতাশা দেখলাম, সেটা শুধু দোকান সরানোর নয় – সেটা একটা সৃষ্টিকে অসম্পূর্ণ রেখে যাওয়ার বেদনা।
বাজারে একজন তরুণ তার প্রথম দোকান খুলেছে। সবকিছু নিজের হাতে সাজিয়েছে, স্বপ্নের আয়োজন করেছে। কিন্তু তার চোখে ভয়ও দেখি। “যদি ব্যর্থ হই? যদি কেউ না আসে?” সৃষ্টির সাথে সাথে ধ্বংসের আশঙ্কাও জন্ম নেয়। যেন প্রতিটা নতুনত্বের সাথে একটা মৃত্যুর সম্ভাবনা এসে দাঁড়ায়।
আমার মনে হয়, আমাদের ভেতরে দুটো শক্তি অনন্তকাল ধরে যুদ্ধ করে। একটা বলে, “সৃষ্টি কর, নতুন কিছু তৈরি কর।” আরেকটা ফিসফিস করে বলে, “সব নষ্ট হয়ে যাবে, কেন ঝামেলায় যাস?”
এই ভয়টা কোথা থেকে আসে? আমরা দেখেছি ফুল ঝরে যায়, বাড়ি ভেঙে পড়ে, মানুষ মরে যায়। আমরা জানি যে আমাদের সব সৃষ্টিই ক্ষণস্থায়ী। তাহলে কেন আমরা সৃষ্টি করি? এই জেনেও যে সব একদিন শেষ হয়ে যাবে?
হয়তো এখানেই মানুষের মাহাত্ম্য। আমরা জানি আমাদের গড়া সব ভেঙে যাবে, তবুও আমরা গড়ি। আমরা জানি আমাদের লেখা হারিয়ে যাবে, তবুও আমরা লিখি। আমরা জানি আমাদের ভালোবাসা একদিন শেষ হবে, তবুও আমরা ভালোবাসি।
ট্রেনে একজন বৃদ্ধ গার্ডেনার তার নাতিকে বলছেন, “বেটা, গাছ লাগা। জানি সব গাছ মরে যায়, কিন্তু নতুন গাছ হয়।” এই বৃদ্ধ জানেন সৃষ্টি আর ধ্বংসের চক্র। কিন্তু তিনি চক্রটাকে ভয় না পেয়ে সহযোগী করেছেন।
আমার ভেতরেও এই দ্বন্দ্ব আছে। আমি লিখতে চাই, কিন্তু ভাবি “কেউ পড়বে কি?” আমি স্বপ্ন দেখি, কিন্তু ভাবি “পূরণ হবে কি?” আমি পরিকল্পনা করি, কিন্তু ভাবি “সব উল্টে যাবে কি?”
কিন্তু এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, ধ্বংসের ভয় যদি আমাদের সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখে, তাহলে আমরা মৃত। আর যদি সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা আমাদের ধ্বংসের বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়, তাহলে আমরা বোকা।
হয়তো প্রকৃত জ্ঞান হলো দুটোকেই স্বীকার করা। ধ্বংস জেনেও সৃষ্টি করা। সৃষ্টি করেও ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত থাকা। যেমন সেই শিশুটি – কেঁদেছে, কিন্তু আবার নতুন দুর্গ বানানো শুরু করেছে।
হয়তো এটাই জীবন – ক্ষণস্থায়ীতার পূর্ণ সচেতনতা নিয়ে চিরন্তন সৃষ্টিতে মগ্ন থাকা।
একটু ভাবনা রেখে যান