
চায়ে দু’চামচ চিনি দেওয়া হয়। কিন্তু কেন দু’চামচ? কারণ মা দিতেন। এটুকু বুঝলেই একটা ভয়ানক প্রশ্ন উঠে আসে — তাহলে এই পছন্দটা কার? নিজের, নাকি মায়ের?
বেশিরভাগ মানুষ এই প্রশ্নটা কখনো করে না। কারণ উত্তরটা সহজ না।
যা “নিজের পছন্দ” বলে মনে হয়, তার অধিকাংশ আসলে উত্তরাধিকার। বাবার অভ্যাস, মায়ের ভয়, দাদার চুপ করে থাকার ধরন, নানীর রান্নার পদ্ধতি — এসব একটু একটু করে ঢুকে যায়। এবং এতটাই ধীরে ঢোকে যে টেরই পাওয়া যায় না। একদিন আয়নায় তাকালে দেখা যায় — মায়ের চোখ, বাবার নাক, দাদার কপাল। নিজের কী আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন।
সন্ধ্যায় ছাদে চুপ করে বসার অভ্যাস আছে? বাবাও বসতেন। রাস্তায় একটা পুরনো গান শুনলে বুকের ভেতরে কিছু একটা নড়ে ওঠে? কারণ ওই গানের সাথে একটা স্মৃতি জুড়ে আছে। কিন্তু গানটা কি আসলে পছন্দের, নাকি স্মৃতিটা পছন্দের? এই দুটো এক জিনিস না। কিন্তু আলাদা করা যায় না।
মানুষ আসলে একটা ভূতের সংগ্রহালয়। ভেতরে অনেক ভূত বাস করে — মৃত মানুষদের, পুরনো অভ্যাসের, শেখানো ভয়ের। এবং এই ভূতগুলোই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেয়। যখন মনে হয় “আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি”, তখন আসলে অনেকে মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যটা হলো — হয়তো “নিজের” বলে আলাদা কিছু নেই। হয়তো যাকে “আমি” বলা হয়, সে শুধু একটা সংকলন। বাবার কণ্ঠ, মায়ের অভ্যাস, সমাজের নিয়ম, শৈশবের ভয় — এসব মিলিয়ে একটা মানুষ তৈরি হয়। এবং সেই মানুষটাই ভাবে সে স্বাধীন।
কিন্তু এখানেই একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
অচেতনভাবে অনুসরণ করা আর সচেতনভাবে বেছে নেওয়া — এই দুটো এক জিনিস না। দু’চামচ চিনিই হয়তো দেওয়া হবে, কিন্তু কারণটা বদলে যেতে পারে। “মা দিতেন” থেকে “এটাই পছন্দ” — এই যাত্রাটুকুই আসলে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। ছোট্ট পার্থক্য। কিন্তু এখানেই সব।
উত্তরাধিকার থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা সম্ভব না। এটা মানুষ হওয়ার শর্ত। পূর্বপুরুষদের রক্তে, হাড়ে, অভ্যাসে বহন করতেই হয়। কিন্তু চোখ খোলা রাখা যায়। দেখা যায় — এই কাজটা কেন করা হচ্ছে। এই পছন্দটা আসলে কার। এই ভয়টা কোথা থেকে এল।
এবং যখন দেখা যায়, তখন একটা ছোট্ট সুযোগ তৈরি হয়। পরিবর্তন করার না — শুধু জানার। “এটা মায়ের অভ্যাস, কিন্তু আমিও রাখছি কারণ ভালো লাগে” — এই একটা বাক্যের মধ্যেই স্বাধীনতা আছে। অন্ধ অনুসরণ আর সচেতন বেছে নেওয়ার মধ্যে পুরো একটা জীবনের ফারাক।
এই প্রশ্নটা না করলে সারাজীবন অন্যদের স্বপ্ন দেখে কাটিয়ে দেওয়া যায়। এবং শেষ মুহূর্তে বোঝা যায় — পুরোটাই অন্যের ছিল।

একটু ভাবনা রেখে যান