\
কালো স্যুট পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। টাই গলায় পেঁচানো একটা রশি মনে হচ্ছে। কিন্তু এই রশি আমাকে ঝুলিয়ে মারে না, বেঁচে রাখে। একটা ভুয়া জীবনে।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি—মানিব্যাগে তিনশো টাকা। কিন্তু স্যুট দেখে কেউ বুঝবে না আমার পকেট খালি। কর্পোরেট জগতের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো এই পোশাক। যে যত দামি স্যুট পরে, সে তত সফল। কিন্তু স্যুট খুলে ফেললে দেখা যায় ভিতরে একটা ভাঙা মানুষ দাঁড়িয়ে।
প্রেজেন্টেশনের আগে বাথরুমে গিয়ে হাত ধুচ্ছি। আয়নায় দেখি একটা পালিশ করা মুখ। চোখে আত্মবিশ্বাসের ভান, ঠোঁটে হাসির নকল। কিন্তু হাত কাঁপছে। পেট গুড়গুড় করছে। এইটুকুই আমার সত্য।
মিটিংরুমে ঢুকে হাত মিলিয়ে বলি, “গুড মর্নিং!” কণ্ঠস্বর জোরালো, কনফিডেন্ট। কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রশ্ন—আজকেও কি চাকরি থাকবে? আজকেও কি এই নাটক চালিয়ে যেতে পারব?
ক্লায়েন্টের সামনে পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা করছি। স্ক্রিনে গ্রাফ, চার্ট, পরিসংখ্যান। সবকিছু পারফেক্ট দেখাচ্ছে। কিন্তু যে মানুষটা উপস্থাপনা করছে, সে পারফেক্ট না। সে ভয় পেয়ে আছে। কিন্তু স্যুট তার ভয় লুকিয়ে রাখে।
লাঞ্চের সময় সিনিয়র ম্যানেজারদের সাথে বসি। তারা গল্ফ নিয়ে কথা বলে। আমি হাসি, মাথা নাড়ি। কিন্তু গল্ফ জানি না, খেলি না। সামর্থ্যও নেই। তবুও অভিনয় করি যেন আমিও সেই জগতের।
দুপুরে ক্যাবিনেটে বসে কফি খাই। হাতে একটা ইমেইল এসেছে—বেতনের টাকায় কাটতি। কারণ “কোম্পানির আর্থিক সংকট।” কিন্তু সিইও গতকাল নতুন বিএমডব্লিউ কিনেছে। সংকট শুধু আমাদের মতো ছোট মাছদের।
স্যুটের ভিতরে লুকিয়ে আছে একটা সাধারণ মানুষ। যার স্বপ্ন ছিল, যার নিজস্ব মতামত ছিল। কিন্তু কর্পোরেট জগত তাকে একটা পোশাকের ভিতরে বন্দি করে রেখেছে। এই পোশাক তার পরিচয় হয়ে গেছে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। স্যুট খুলে রাখি। হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দিই। কাল আবার পরব। আবার সেই নাটক। কিন্তু রাতে একা থাকলে ভাবি—এই স্যুটটা কি আমার সুরক্ষা, নাকি আমার কারাগার?
আমি কি স্যুট পরি, নাকি স্যুট আমাকে পরে?
কখনো কি সেই দিন আসবে যেদিন আমি স্যুট ছাড়া নিজেকে উপস্থাপন করার সাহস পাবো? নাকি এই পোশাক আমার চামড়া হয়ে গেছে?
স্যুটের ভিতরে একটা অসহায় মানুষ আর্তনাদ করে। কিন্তু বাইরের জগত শুনতে পায় শুধু কনফিডেন্ট এক্সিকিউটিভের কণ্ঠস্বর।
একটু ভাবনা রেখে যান