আমার ড্রয়ারে একটা খাতা আছে। সেখানে লেখা আছে আমার স্বপ্নের তালিকা।
একটা উপন্যাস লিখব। একটা কবিতার বই প্রকাশ করব। দেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক হব।
আরাশের জন্মের আগে লেখা এই তালিকা।
আজ আমি সেই খাতা খুলে দেখি। এগারো বছরে কতটুকু পূরণ হয়েছে?
কিছুই না।
আমি হিসাব করি। আরাশের জন্য আমি দিনে কত ঘণ্টা কাজ করি। তার খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, চিকিৎসা—সব মিলে কত সময় যায়।
আমার নিজের জন্য দিনে দুই ঘণ্টা থাকে। সেটাও ক্লান্তিতে নষ্ট হয়।
কখন লিখব? কখন স্বপ্ন দেখব?
আমার বন্ধু মৃদুল কানাডায় গিয়ে একটা বই লিখেছে। সে আমাকে পাঠিয়েছে। খুব ভালো লিখেছে।
আমি পড়ে ভাবি, আমিও কি পারতাম এমন লিখতে?
হয়তো পারতাম। যদি আমার সন্তান না থাকত।
এই ভাবনাটা আমাকে অপরাধী করে তোলে।
আমি কি আরাশকে আমার স্বপ্নের শত্রু ভাবছি?
না, আমি তাকে ভালোবাসি। কিন্তু এটাও সত্য যে তার জন্য আমার স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিতে হয়েছে।
আমি ভাবি, আমার বাবাও কি এমন কোনো স্বপ্ন ছেড়েছিলেন আমার জন্য?
তিনি কি শিল্পী হতে চেয়েছিলেন? গায়ক হতে চেয়েছিলেন? লেখক হতে চেয়েছিলেন?
কিন্তু আমার জন্য সব ছেড়ে দিয়ে একটা চাকরিতে আটকে গেছিলেন?
হয়তো প্রতিটি বাবাই এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যায়। সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেয়।
কিন্তু এটা কি ঠিক?
আমি যদি আমার স্বপ্ন পূরণ করতাম, তাহলে কি আরাশের জন্য একটা ভালো উদাহরণ হতাম?
সে দেখত তার বাবা একজন সফল লেখক। সেও স্বপ্ন দেখত বড় কিছু হওয়ার।
কিন্তু এখন সে দেখে তার বাবা একজন সংগ্রামী মানুষ, যার কোনো বিশেষ পরিচয় নেই।
আমি ভাবি, আরাশ বড় হলে কি সেও তার স্বপ্ন বিসর্জান দেবে তার সন্তানের জন্য?
এভাবে কি প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্বপ্ন হারিয়ে যায়?
না। আমি চাই না এমন হোক।
আমি সিদ্ধান্ত নিই। আমি আবার লিখব। রাতে ঘুমের সময় কমিয়ে হলেও লিখব।
আমি চাই আরাশ দেখুক যে তার বাবা শুধু একজন দায়িত্বশীল মানুষই নয়। একজন স্বপ্নবান মানুষও।
সন্তানের দায়িত্ব আর নিজের স্বপ্ন—দুটো একসাথে চালানো যায়।
কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়।
একটু ভাবনা রেখে যান