কথা

স্বপ্ন

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ঘুম ভাঙল।

মৃদুল বসে আছে। চা খাচ্ছি দুজনে। কথা হচ্ছে।

চোখ খুললাম।

মৃদুল নেই। রুম ফাঁকা।

ফোন তুলে দেখি। কোনো মেসেজ নেই। তিন মাস হলো বিদেশে গেছে।

চায়ের স্বাদ মুখে লেগে আছে। কীভাবে?


হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

“স্বপ্ন দেখলাম।”

“কী দেখলে?”

“মৃদুল এসেছিল।”

“ও এখন তো বিদেশে।”

“জানি। তবু মনে হচ্ছে সে এসেছিল।”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কখনো কখনো স্বপ্ন আসলের চেয়ে বেশি মনে হয়।”


বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একই স্বপ্ন দেখতাম বারবার।

পরীক্ষার হলে বসে আছি। প্রশ্ন দেখছি। কিছু লিখতে পারছি না। হাত অবশ। কলম পড়ে যাচ্ছে।

সবাই লিখছে। আমি বসে আছি।

সময় শেষ। খাতা জমা দিতে হবে। খালি।

ঘুম ভেঙে উঠে বসতাম। বুক ধড়ফড় করছে। ঘাম হয়েছে।

তখন কখনো কাউকে বলিনি এই স্বপ্নের কথা। সবাইকে বলতাম, “আমি ভাল আছি। সব ঠিক আছে।”

কিন্তু স্বপ্ন জানত।


আরাশ একদিন স্কুল থেকে এসে বলল, “বাবা, আমি উড়ছিলাম।”

“কখন?”

“স্বপ্নে। রাতে। আমি উড়ছিলাম। সত্যি।”

“ভালো লাগল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর মনে হলো, আমি কি সত্যিই উড়েছিলাম?”

“তোমার কী মনে হয়?”

“জানি না। মনে হয় উড়েছিলাম। কিন্তু এখন তো উড়তে পারছি না।”

“তাহলে?”

আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে স্বপ্ন কি মিথ্যা?”

কী বলব জানি না।


গত বছর একটা সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলাম। সপ্তাহখানেক ধরে। কিছু বুঝতে পারছিলাম না।

এক রাতে স্বপ্ন দেখলাম।

স্পষ্ট দেখলাম। সমাধান। সহজ।

ঘুম ভেঙে উঠে লিখে রাখলাম। সকালে দেখলাম।

কাজ করছে।

কিন্তু আমি তো জানতাম না এই সমাধান। তাহলে স্বপ্নে কে দেখাল?


মা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “আমি চলে গেলে স্বপ্নে দেখো আমাকে।”

“কেন?”

“স্বপ্নে দেখলে মনে হবে আমি আছি। তাই না?”

চুপ করে রইলাম।

মা হাসলেন। “তুমি বিশ্বাস করো না। কিন্তু স্বপ্ন আর জাগা কি আলাদা?”

“আলাদা তো।”

“কীভাবে জানো?”

উত্তর দিতে পারিনি।


মা মারা যাওয়ার পর প্রথম স্বপ্ন দেখলাম তিন মাস পর।

মা রান্নাঘরে। রান্না করছেন। আমি ঢুকলাম।

“মা।”

“কী?”

“তুমি তো…”

“কী?”

বলতে পারলাম না। কী বলব? তুমি তো মারা গেছ?

মা হাসলেন। “খাবে?”

“হ্যাঁ।”

খেলাম। স্বাদ মুখে লাগল।

ঘুম ভাঙল। রান্নাঘরে গেলাম। ফাঁকা।

স্বাদ এখনও মুখে।


সাইফুল জিজ্ঞেস করল, “স্বপ্নে কি কখনো জানতে পারো যে তুমি স্বপ্ন দেখছ?”

“না। তুমি?”

“কখনো কখনো। তখন অদ্ভুত লাগে। জানি যে স্বপ্ন, তবু সব সত্যি মনে হয়।”

“তারপর?”

“তারপর ঘুম ভাঙে। মনে হয় কোনটা স্বপ্ন ছিল, কোনটা জাগা।”

“দুটো কি আলাদা?”

সাইফুল চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না। হয়তো না।”


এক রাতে স্বপ্ন দেখলাম বাবা এসেছেন।

“কেমন আছো?”

“ভালো। তুমি?”

“ভালো।”

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম।

“বাবা, তুমি কি সত্যি এখানে?”

বাবা হাসলেন। “তুমি কী মনে করো?”

“জানি না।”

“তাহলে?”

“তাহলে হয়তো আছো। হয়তো নেই।”

বাবা উঠে দাঁড়ালেন। “যাই এবার।”

“কোথায়?”

“জানি না। যেখান থেকে এসেছি।”

ঘুম ভাঙল। ঘর ফাঁকা।

কাঁদলাম না। কাঁদতে পারলাম না।


আরাশ আবার জিজ্ঞেস করল, “বাবা, মানুষ কি মরে গেলে স্বপ্নে থাকে?”

“কেন জিজ্ঞেস করছ?”

“দাদুকে তো দেখিনি আমি। কিন্তু স্বপ্নে দেখি। তাহলে উনি কি আছেন?”

“তুমি কী মনে করো?”

“মনে হয় আছেন। কিন্তু ছুঁতে পারি না।”

“ছুঁতে পারলেই কি থাকা?”

আরাশ চুপ করে রইল।


একদিন হ্যাপি বলল, “আমি স্বপ্ন দেখলাম আমরা দুজনে বিয়ে করিনি।”

“তারপর?”

“তারপর অন্য জীবন। অন্য মানুষ। সব অন্যরকম।”

“কেমন লাগল?”

“ভয় লাগল। ঘুম ভেঙে দেখলাম তুমি পাশে শুয়ে আছো। তখন স্বস্তি হলো।”

“স্বপ্ন তো। ভয় পাওয়ার কী আছে?”

হ্যাপি তাকাল। “স্বপ্নেও তো লাগে সব। ভয়, কষ্ট, আনন্দ। তাহলে কি মিথ্যা?”

উত্তর দিতে পারলাম না।


রাতে আবার স্বপ্ন দেখলাম।

একটা ঘর। চিনি না। কিন্তু মনে হচ্ছে চিনি।

কেউ ডাকছে। কে? জানি না।

ঘর থেকে বেরোতে পারছি না। দরজা খুলছে না।

জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি। আমি দাঁড়িয়ে আছি। নিচে। হাঁটছি।

আমি ঘরে। আমি রাস্তায়। দুজন।

কোনটা আমি?

ঘুম ভাঙল।

বারান্দায় দাঁড়ালাম। রাস্তা ফাঁকা। কেউ নেই।


বাবু একদিন বলল, “তুমি কি ভয় পাও?”

“কীসের?”

“যে হয়তো এটাও স্বপ্ন। এখন যা হচ্ছে, এটাও।”

চুপ করে রইলাম।

“কখনো মনে হয়?”

“হয়। রাতে। হঠাৎ মনে হয় জেগে আছি নাকি স্বপ্ন দেখছি।”

“তারপর?”

“তারপর নিজেকে চিমটি কাটি। ব্যথা লাগে। তখন বুঝি জেগে আছি।”

বাবু হাসল। “কিন্তু স্বপ্নেও তো চিমটি কাটা যায়। স্বপ্নেও ব্যথা লাগে।”


স্বপ্নে সময় অদ্ভুত।

মনে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটল। ঘুম ভাঙে, দেখি পাঁচ মিনিট।

আবার মনে হয় মাত্র এক মুহূর্ত। ঘড়ি দেখি, এক ঘণ্টা।

তাহলে সময় কি স্থির? নাকি আমার মনে মনে হয় শুধু?


সুলতান বলেছিল, “আমার দাদা বলতেন, স্বপ্ন হলো আরেক জীবন। ঘুমালে সেখানে যাই। জাগলে ফিরি।”

“তুমি বিশ্বাস করো?”

“জানি না। কিন্তু মাঝেমাঝে মনে হয়। স্বপ্নে যা দেখি, তাও তো আমার। তাহলে দুটো জীবন?”

“হয়তো।”

“তাহলে কোনটা আসল?”

“দুটোই। অথবা কোনোটাই না।”


আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে পড়ল না কিছু।

স্বপ্ন দেখেছিলাম। কী দেখেছিলাম? মনে নেই।

চেষ্টা করলাম মনে করতে। পারলাম না।

কিন্তু একটা অনুভূতি রয়ে গেছে। ভারী। চাপা।

যা মনে নেই, তা কি ছিল?


হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কখনো চাও স্বপ্ন না দেখতে?”

“কেন?”

“মাঝেমাঝে মনে হয়। স্বপ্ন দেখলে ঘুম ভাঙার পর একটু কষ্ট হয়। মনে হয় কী ছিল, কী হারালাম।”

“কিন্তু স্বপ্ন না দেখলে?”

“তাহলে হয়তো শুধু ঘুম। কালো। কিছু না।”

“সেটা ভালো?”

হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না। হয়তো না।”


আরাশ স্কুল থেকে এসে বলল, “বাবা, আমি আজ স্বপ্ন দেখলাম আমি বড় হয়ে গেছি।”

“কত বড়?”

“তোমার মতো। দাড়ি হয়েছে।”

“কেমন লাগছিল?”

“অদ্ভুত। আমি আমি, কিন্তু আমি না।”

“বুঝতে পারছিলে স্বপ্ন?”

“না। মনে হচ্ছিল সত্যি। তারপর ঘুম ভাঙল। আমি ছোট। কিন্তু মনে হচ্ছে বড় হওয়াটা সত্যি ছিল।”

“হয়তো ছিল।”

“কীভাবে?”

“জানি না। হয়তো স্বপ্ন দেখায় কী হবে।”

“নাকি কী হতে পারত?”

“হয়তো দুটোই।”


রাতে জেগে আছি। ঘুম আসছে না।

ভয় হচ্ছে। ঘুমালে কী দেখব?

নাকি ভয় এই—জেগে আছি নিশ্চিত না।

হ্যাপি ঘুমিয়ে। আরাশ ঘুমিয়ে।

আমি জেগে আছি। মনে হয়।

চিমটি কাটলাম। ব্যথা লাগল।

কিন্তু বাবু যা বলেছিল…


একটা স্মৃতি আছে। নিশ্চিত না এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি।

ছোটবেলা। মা হাত ধরে হাঁটাচ্ছেন। রাস্তায়।

একটা দোকান। আইসক্রিম কিনে দিলেন।

খেলাম। মিষ্টি।

কিন্তু এই ঘটনা কি সত্যি হয়েছিল? নাকি স্বপ্ন?

মাকে জিজ্ঞেস করার সুযোগ ছিল না। মা চলে গেছেন।

এখন জানার উপায় নেই।

কিন্তু স্বাদ মনে আছে।

তাহলে?


সকাল হলো। ঘুম ভাঙল।

স্বপ্ন দেখেছিলাম। কী দেখেছিলাম?

মৃদুল। চা। কথা।

এখন নিশ্চিত না। সত্যি দেখলাম? নাকি মনে হচ্ছে দেখেছিলাম?

ফোন তুলে মেসেজ পাঠালাম। “কেমন আছিস?”

উত্তর আসবে কয়েক ঘণ্টা পর। সময়ের তফাত।

কিন্তু স্বপ্নে তো সময় নেই।

স্বপ্নে মৃদুল এখানে। জেগে নেই।

কোনটা সত্য?

চা বানালাম। খেলাম।

স্বাদ ভালো।

কিন্তু স্বপ্নের চায়ের স্বাদ কেমন ছিল? মনে নেই।

মনে আছে শুধু—স্বাদ ছিল।

এটুকুই হয়তো।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *