ব্লগ

অদৃশ্য তারহীন জগৎ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“নো ইন্টারনেট কানেকশন” – এই লেখাটা দেখতেই আমার মনে হল যেন পৃথিবীর সাথে আমার সব সূতো কেটে দেওয়া হয়েছে।

হ্যাপি ভাত বাড়ছিল। আমি বললাম, “ওয়াইফাই গেছে।” ও মুখ তুলে তাকাল, “তো? ভাত খাও।” আমি বুঝলাম, আমার কষ্টটা ওর কাছে হাস্যকর লাগছে। কিন্তু আমি কিভাবে বোঝাবো যে এই মুহূর্তে আমি যেন একটা দ্বীপে আটকা পড়েছি?

আরাশ এসে বলল, “বাবা, ইউটিউবে কার্টুন দেখব।” আমি অসহায়ের মতো বললাম, “নেট নাই।” ওর মুখটা যেন একটু হতাশ হল, তারপর ও বই নিয়ে বসে গেল। আমি ভাবলাম, এই ছেলেটা কি আমার চেয়ে বেশি মানিয়ে নিতে পারে?

রাউটারের লাইট দেখি – লাল। যেন একটা মৃত চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি রিস্টার্ট দিলাম। দুই মিনিট অপেক্ষা। আবার লাল। আমার বুকের ভিতর একটা খোঁচাখুঁচি শুরু হল।

মনে পড়ে গেল, আমার দাদু যখন গ্রামে থাকতেন, সকালে উঠে প্রথমেই বারান্দায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেন। আবহাওয়া বুঝতেন। মাঠের দিকে চোখ রাখতেন। ফসলের খোঁজ নিতেন। পাখির ডাক শুনে সময় বুঝতেন।

আর আমি? সকালে উঠে প্রথমেই ফোন হাতে নিই। ওয়েদার অ্যাপ চেক করি। নিউজ স্ক্রল করি। ফেসবুকে দেখি কে কী ভাবছে। আমার দাদুর চেয়ে আমি কি বেশি জানি, নাকি কম?

এখন যখন নেট নেই, মনে হচ্ছে আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন ঝাপসা হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম – রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। গাড়ি যাচ্ছে। কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এগুলো যেন সব নকল। আসল জীবন হচ্ছে ইন্টারনেটে।

হঠাৎ বিদ্যুৎ গেল। এবার পুরোপুরি অন্ধকার। আমি বসে রইলাম চেয়ারে। হ্যাপি মোমবাতি জ্বালল। আরাশ বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে মোমবাতির আলোয়। আমি দেখলাম, ওরা দুজনেই স্বাভাবিক।

“আমি কি সত্যিই আদিম যুগে ফিরে গেছি?” – মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।

তারপর বুঝলাম, আদিম যুগে মানুষ প্রকৃতির উপর নির্ভর করত। আমি নির্ভর করি একটা অদৃশ্য নেটওয়ার্কের উপর, যেটা এমনিতেই আছে কিনা বোঝা যায় না। আমার দাদু জানতেন আকাশে মেঘ দেখে বৃষ্টি হবে। আমি জানি না ওয়াইফাই সিগন্যাল কেন দুর্বল।

বিদ্যুৎ ফিরে এল। রাউটারের লাইট আবার সবুজ হল। আমার ফোনে নোটিফিকেশনের বন্যা। যেন পৃথিবী আমাকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেল – যে সভ্যতা একটা সিগন্যাল হারিয়ে গেলেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, সেটা আসলে কতটা এগিয়ে?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *