আজ সকালে অফিসে এক সহকর্মীর মা মারা গেছেন। সে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। আমি লাইক দিয়েছি। তারপর কমেন্টে লিখেছি “RIP aunty।” আর কিছু করিনি। তার মুখের দিকে তাকাইনি। হাত ধরে বলিনি “আমি আছি।” শুধু একটা ইমোজি আর তিনটা ইংরেজি শব্দ।
রাস্তায় ফিরতে ফিরতে ভাবলাম – আমি কবে থেকে এত ঠান্ডা হয়ে গেলাম? কবে থেকে সাইবার স্পেসের এই নীল আলোর মধ্যে আমার হৃদয়ের উষ্ণতা হারিয়ে ফেলেছি?
বাড়িতে দেখি আরাশ তার বন্ধুদের সাথে গেম খেলছে অনলাইনে। সবাই ভয়েস চ্যাটে কথা বলছে। কিন্তু কেউ কারো চোখে তাকাচ্ছে না।
“তোর বন্ধুদের সাথে কেমন লাগে কথা বলতে?”
“ভালো লাগে বাবা। আমরা একসাথে মিশন কমপ্লিট করি।”
“কিন্তু তুই জানিস ওদের কেউ কেমন দেখতে?”
আরাশ একটু থেমে বলল, “না। কিন্তু আমি জানি ওরা কেমন খেলে।”
“সেটা কি যথেষ্ট?”
আরাশ গেম বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। “বাবা, তুমি কি মনে করো আমরা মানুষ হওয়া ভুলে যাচ্ছি?”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ ক্র্যাশ করল যার নাম “আত্মতুষ্টি ভার্সন ফাইনাল”।
হ্যাপির সাথে রাতে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। “আমার মনে হয় আমরা চ্যাট করতে করতে কথা বলতে ভুলে গেছি।”
“কেন?”
“চ্যাটে আমরা ভেবেচিন্তে লিখি। কিন্তু মানুষের সাথে কথা বলার সময় যে সহজাত প্রবৃত্তি, সেটা হারিয়ে যাচ্ছে।”
হ্যাপি বলল, “হায়দার, আমার বোনের সাথে আমি প্রতিদিন ভিডিও কল করি। কিন্তু গতকাল যখন সে এসেছিল, আমরা কী নিয়ে কথা বলব বুঝতে পারছিলাম না।”
“কেন?”
“কারণ আমরা অনলাইনে সব কথা বলে ফেলেছি। সামনাসামনি আর নতুন কিছু ছিল না।”
আমি বুঝলাম। সাইবার স্পেস আমাদের কথা বলার প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। কিন্তু কথা বলার ভাষা কেড়ে নিয়েছে।
পরদিন রহিম চাচার বাড়িতে গেলাম। তিনি আমাদের চা দিয়ে বসালেন। আরাশের কপালে হাত রেখে দোয়া করলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে খোঁজ নিলেন চাকরির।
“চাচা, আপনি কোনো ফোন ব্যবহার করেন না। কিন্তু আমাদের চেয়ে মানুষের সাথে ভালো যোগাযোগ রাখেন কেন?”
চাচা হেসে বলললেন, “বাবা, মানুষ তো শরীর আর রূহ নিয়ে। ফোনে শুধু কথা যায়। স্পর্শ যায় না। আমি যখন তোর কাঁধে হাত রাখি, তুই বুঝতে পারিস আমি তোর পাশে আছি। এটা কোনো মেসেজে পাঠানো যায় না।”
আরাশ বলল, “চাচা, কিন্তু অনলাইনে আমরা অনেক বেশি মানুষের সাথে কথা বলতে পারি।”
“পারো বাবা। কিন্তু কতজনের কষ্ট বুঝতে পারো?”
আরাশ চুপ হয়ে গেল।
রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর সাথে আমার যোগাযোগ কি সাইবার স্পেসের মতো? দূর থেকে, পর্দার আড়াল থেকে? না। এখানে আমি সিজদায় গিয়ে তাঁর কাছাকাছি অনুভব করি। এখানে কোনো স্ক্রিন নেই।
আমার বাবার কথা মনে পড়ল। তিনি আমাকে কোনো মেসেজ পাঠাতেন না “ভালো ছেলে হও” বলে। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বলতেন। সেই স্পর্শে যে ভালোবাসা ছিল, সেটা আজও আমার মাথায় অনুভব করি।
কিন্তু আমি আরাশকে কবে শেষবার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছি? কবে চোখে চোখ রেখে বলেছি “আমি তোর জন্য গর্বিত”?
হয়তো সাইবার স্পেসে হারিয়ে যাওয়া মানবিকতা খোঁজার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আমাদের ঘরে ফিরে আসা। স্ক্রিন বন্ধ করে চোখ খোলা।
আরাশের ঘরে গিয়ে দেখি সে ঘুমিয়ে আছে। ফোনটা হাতের পাশে। আমি ফোনটা সরিয়ে তার মাথায় হাত রাখলাম। “আল্লাহ তোকে ভালো রাখুন।”
সে ঘুমের মধ্যেই মৃদু হাসল।
বুঝলাম, সাইবার স্পেসে মানবিকতা হারিয়ে যায় না। আমরা মানবিকতা সাইবার স্পেসে রেখে আসি।
ঠান্ডা আলোর বিপরীতে উষ্ণ স্পর্শ। এটাই হয়তো প্রতিষেধক।
একটু ভাবনা রেখে যান