প্লেটে ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। তরকারিতে একটা পাতলা চামড়া পড়েছে উপরে। যে খাবার আধঘন্টা আগে গরম গরম ছিল, এখন সেটা দেখতে একদম নিস্প্রাণ লাগছে। হ্যাপি বলছে, “গরম করে নাও।” সহজ কথা। কিন্তু আমার শরীরটা যেন পাথর হয়ে গেছে।
রান্নাঘরে যেতে পারছি না। পাঁচ কদম হাঁটতে পারছি না। চুলা জ্বালানো তো দূরের কথা। এমন একটা অদ্ভুত অবস্থা যেটা ব্যাখ্যা করার ভাষা আমার কাছে নেই। আমি কি অলস? নাকি অসুস্থ? নাকি এমনই কোনো অবস্থা, যার নাম এখনো জানি না?
খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকি। জানি যে ঠান্ডা খেলে পেট খারাপ হবে। জানি যে গরম খাবারের স্বাদ অনেক বেশি। কিন্তু তবুও উঠতে পারছি না। যেন আমার ইচ্ছাশক্তি আর শরীরের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই।
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আপনি কেন বসে আছেন?” আমি বলি, “একটু পরে গরম করব।” কিন্তু আমি নিজেই জানি সেই ‘একটু পরে’ কখনো আসবে না। আমি এই ঠান্ডা খাবারটাই খেয়ে নেব। কারণ গরম করার চেয়ে ঠান্ডা খেয়ে নেওয়াটা সহজ।
এই অলসতা নিয়ে আমার লজ্জা লাগে। কত সহজ একটা কাজ – গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে প্লেটটা গরম করা। দুই মিনিটের কাজ। কিন্তু সেই দুই মিনিট যেন দুই ঘন্টার মতো মনে হয়।
মনে পড়ে যায় বাবার কথা। তিনি কখনো ঠান্ডা খেতেন না। যতই ব্যস্ততা থাক, গরম করে নিতেন। আমি কেন পারি না? আমার চরিত্রের কোন দুর্বলতার কারণে এই অবস্থা?
হ্যাপি এসে নিজেই গরম করে দিয়ে যায়। আমার প্রতি তার এই মমতা দেখে আরো লজ্জা লাগে। আমি কি এতটাই অক্ষম যে নিজের খাবারও গরম করতে পারি না?
গরম খাবার খেতে খেতে ভাবি, আমাদের জীবনে কতগুলো এমন মুহূর্ত আছে যেখানে আমরা জানি কোনটা সঠিক, কিন্তু তবুও সেটা করতে পারি না। এটা কি মানসিক অসুস্থতা? নাকি শুধুই আলস্য?
অফিসেও এমন হয়। জানি যে কাজটা এখনই করা উচিত, কিন্তু ফেলে রাখি পরের জন্য। ঘরেও এমন। জানি যে এটা ঠিক করা দরকার, কিন্তু মন চায় না।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে আমার এই অবস্থা, এর থেকে কি মুক্তি আছে? নাকি এটাই আমার চরিত্র?” কিন্তু মনে হয় যেন আল্লাহও হাসছেন আমার এই ছোট ছোট দুর্বলতা দেখে।
রাতে শুয়ে ঠিক করি, আগামীকাল থেকে খাবার ঠান্ডা হলেই গরম করে নেব। কিন্তু জানি যে আগামীকাল আবার সেই একই অবস্থা হবে। আবার সেই একই দ্বন্দ্ব।
কিন্তু হয়তো এটাই জীবন। আমরা সবাই কোথাও না কোথাও আটকে আছি। কেউ বড় বিষয়ে, কেউ ছোট বিষয়ে। আমি আটকে আছি ঠান্ডা খাবার গরম করার মতো সাধারণ কাজেও।
এই অলসতা, এই অক্ষমতা, এই দুর্বলতা – সবই হয়তো আমার পরিচয়ের অংশ। অস্বীকার করার কিছু নেই। মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান