ব্লগ

থেমে যাওয়া স্বপ্ন

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

চিঠিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ঢাকার একটা কোম্পানি থেকে ইন্টারভিউর ডাক। ভাল অবস্থান না, কিন্তু শুরু। পাশের ঘরে মা কাশছেন, বোন পড়াশোনার চাপে মাথা নত করে বসে আছে।

“যাবি তো?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।

“দেখি।” আমার উত্তর।

কিন্তু মনে মনে জানি – যাব না। যেতে পারব না।

ভাই প্রতি মাসে কিছু দেয়। “আমি তো আমার পার্ট করছি,” বলে। কিন্তু মায়ের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, রাতে জেগে সেবা করা, বোনের স্কুলের মিটিংয়ে যাওয়া – এসব কাজে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ভাবি সাহেবও একই কথা বলেন, “আমরা তো যা পারি সাহায্য করি।”

সাহায্য? দূর থেকে ফোনে খোঁজখবর নেওয়া, মাসে একবার বেড়াতে আসা – এটাই তাদের সাহায্য।

মা যখন অসুস্থ হন, আমি আর হ্যাপি হাসপাতালে দৌড়াই। ভাই বলে, “কী হয়েছে? কিছু দরকার হলে বল।” কিন্তু যখন রাত তিনটায় মায়ের জ্বর আসে, তখন আমরাই জেগে থাকি।

হ্যাপিকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেছিলাম। “কে দেখভাল করবে?” দুজনেই কাজ করলে কে থাকবে মায়ের পাশে? কে নিয়ে যাবে বোনকে টিউশনিতে?

অফিসে সহকর্মী বলেছিল, “তুই এত মেধাবী না হলেও, যদি ১০ বছর আগে শুরু করতিস, এখন অনেক এগিয়ে থাকতিস।”

সত্যি কথা। আমি হয়তো খুব বুদ্ধিমান না, কিন্তু সময় আর সুযোগ পেলে পারতাম। কিন্তু যখন ক্যারিয়ার গড়ার বয়স, তখন ব্যস্ত থাকতে হয়েছে মায়ের ওষুধের সময় মনে রাখায়, বোনের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।

“তোমার ভাই কেন আসে না?” হ্যাপি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।

“ওর অনেক কাজ,” আমি বলেছিলাম। আসলে কাজ কার নেই? কিন্তু তারা ভেবেছে, আমাদের কোনো কাজ নেই। আমরা আছি দেখভাল করার জন্য।

রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি – এই দায়িত্বের বণ্টন কে করেছে? কেন ধরে নেওয়া হল যে আমি আর হ্যাপি সব সামলাব?

মা অসুস্থ হলে ভাই ফোন করে বলে, “কিছু করার আছে?” কিন্তু আসে না। ভাবি বলে, “আমারও মন খারাপ।” কিন্তু মনের খারাপের থেকে হাতের কাজটুকু বেশি দরকার।

বোনের বিয়ের সময় ভাই এসেছিল দুই দিন। সব ব্যবস্থাপনা আমাদের। সে শুধু বলেছে, “কী চমৎকার সব হয়েছে।” যেন আয়োজনটা আকাশ থেকে নেমে এসেছে।

এক বন্ধু বলেছিল, “তুই কেন সব একা নিলি? ওদের দায়িত্ব নেই?”

আছে। কিন্তু তারা ভেবেছে দায়িত্ব মানে শুধু মাসিক কিছু দেওয়া। আর আসল কাজ আমাদের।

আজ আরাশ বড় হচ্ছে। সে দেখছে কীভাবে পরিবারের দায়িত্ব একজনের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায়। আমি কী শেখাচ্ছি তাকে?

অফিসে দেখি আমার থেকে ছোট বয়সী ছেলেরা এগিয়ে গেছে। তারা সময়মত নিজেদের পেছনে বিনিয়োগ করেছে। আমি করেছি পরিবারের পেছনে।

“আফসোস হয়?” হ্যাপি একদিন জিজ্ঞেস করল।

“না,” মুখে বললাম। কিন্তু মনে মনে ভাবি – হ্যাপি যা করেছে, সেটা তার পছন্দ ছিল না। আমার বলার কারণে সে চাকরি ছেড়েছে।

ভাই এখন ভাল আছে। নিজের পরিবার নিয়ে সুখে। সে কি কখনো ভাবে, আমাদের কী অবস্থা? নাকি মাসিক কিছু দিয়ে দিলেই দায়মুক্ত?

আমার বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সেও এখন খুশি। মাও শান্তিতে ছিলেন। কিন্তু এই শান্তির দাম দিয়েছি আমরা – আমাদের ক্যারিয়ার দিয়ে, আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে।

রাতের বেলা ভাবি – দায়িত্ব পালনের এই পদ্ধতি কি ঠিক? একজন সব করবে, বাকিরা দূর থেকে উপদেশ দেবে?

আমি সব করেছি কারণ আমাকে করতে হয়েছে। কিন্তু অন্যরা না করার কারণ কী? তাদের সংসার, তাদের কাজ – এসব কি আমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। শুধু জানি – পরিবারে একজনকে সব ত্যাগ করতে হয়, বাকিরা নিশ্চিন্তে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *