জীবন

পায়রা

অক্টোবর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

অফিস থেকে বের হলাম। মোবাইলে চোখ। ইমেইল চেক করছি।

আগামীকাল মিটিং। মনে রাখতে হবে ফাইল নিয়ে যেতে।

সন্ধ্যায় কেনাকাটা। দুধ, ডিম, রুটি।

হাঁটছি। কিন্তু দেখছি না।

লাল লাইট। থামলাম।

চোখ এখনো ফোনে।

হঠাৎ একটা গান শুনলাম। পাশের দোকান থেকে।

“তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়…”

পুরনো গান। চেনা।

ফোন নামালাম।

চারদিকে তাকালাম।

রাস্তার পাশে চায়ের দোকান। ছোট্ট।

একজন বুড়ো মানুষ বসে আছেন। হাতে দানা। পায়রা খাচ্ছে।

দানা পড়ছে। পায়রা খাচ্ছে।

বুড়ো মানুষ হাসছেন। আলতো হাসি।

আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম।

সবুজ লাইট জ্বলল।

কিন্তু আমি হাঁটলাম না।

দাঁড়িয়ে রইলাম।

বুড়ো মানুষ কোথাও যাচ্ছেন না। কারো জন্য অপেক্ষা করছেন না।

শুধু পায়রাদের সাথে আছেন।

কতদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকিনি আমি?

মনে নেই।

সবসময় কোথাও যাচ্ছি। কিছু ভাবছি। কিছু করছি।

কিন্তু শুধু দাঁড়িয়ে থাকা? কতদিন হয়নি?

আকাশের দিকে তাকালাম। বেগুনি রঙ। সন্ধ্যা নামছে।

কবে শেষ আকাশ দেখেছিলাম?

জানি না।

হাওয়া বইছে। গন্ধ আসছে। রান্নার গন্ধ। গাড়ির ধোঁয়া। আর কিসের যেন গন্ধ।

কবে শেষ হাওয়া অনুভব করেছিলাম?

জানি না।

চারপাশে মানুষ হাঁটছে। সবাই তাড়ায়। আমার মতো।

কেউ থামছে না। কেউ দেখছে না।

একটা পায়রার বাচ্চা এসে আমার পায়ের কাছে বসল।

ভয় নেই। শুধু বসে আছে।

আমি নড়লাম না। যদি উড়ে যায়।

পায়রা নড়ল না।

আমরা দুজনে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আমি। পায়রা। বুড়ো মানুষ। চায়ের দোকান। পড়ন্ত বিকেল।

কতক্ষণ?

জানি না। তিন সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড।

কিন্তু মনে হলো অনেকক্ষণ।

পায়রা উড়ে গেল।

আমি হাঁটা শুরু করলাম।

ফোন পকেটে রাখলাম।

প্রতিটা পা ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম।

নিঃশ্বাস নিলাম। গভীর।

হাওয়া ঢুকল। বের হলো।

এত সাধারণ। কিন্তু কেমন যেন লাগছে।

বাসায় পৌঁছলাম।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “দেরি কেন?”

“একটু দাঁড়িয়েছিলাম।”

“কেন? কী হয়েছিল?”

কী বলব?

কিছু হয়নি। কিন্তু কেমন যেন লাগছে।

বললাম, “কিছু না। শুধু একটু দাঁড়িয়ে থাকলাম।”

হ্যাপি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

রাতে শুয়ে ভাবলাম।

সেই বুড়ো মানুষ। পায়রা। দানা।

এত সাধারণ। কিন্তু কেন মনে থাকছে?

জানি না।

পরদিন অফিসে গেলাম। মিটিং হলো।

কিন্তু মনে নেই কী হলো।

শুধু মনে আছে সেই বুড়ো মানুষ।

আরাশকে বললাম, “তুই কখন শেষ আকাশ দেখেছিস?”

“আকাশ? সবসময় তো দেখি।”

“না। দেখা মানে শুধু দেখা। কিছু ভাবা ছাড়া।”

আরাশ ভাবল। “জানি না। হয়তো গতকাল। খেলার সময়।”

“কেমন ছিল?”

“নীল। মেঘ ছিল। সুন্দর।”

আমি কবে শেষ দেখেছি?

মনে নেই।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ভালো আছো?”

“হ্যাঁ। কেন?”

“আজকাল তুমি অন্যরকম।”

“কেমন অন্যরকম?”

“জানি না। কেমন যেন। চুপচাপ। ভাবছো অনেক।”

চুপচাপ? হ্যাঁ। ভাবছি।

কী ভাবছি?

সেই বুড়ো মানুষ। পায়রা।

কেন তিনি এত শান্ত ছিলেন?

কেন আমি শান্ত না?

সাইফুলের সাথে দেখা হলো। বলল, “কী খবর?”

“ভালো। তুই?”

“ঠিক আছে। দেখছি তুই অনেক ব্যস্ত।”

“না। আগের মতো ব্যস্ত না।”

সাইফুল অবাক হলো। “সত্যি? তুই তো সবসময় দৌড়াচ্ছিলি।”

“এখন দৌড়াচ্ছি না।”

“কেন?”

কী বলব?

গতকাল একটা বুড়ো মানুষ পায়রাকে দানা দিচ্ছিলেন?

বললাম, “জানি না। হঠাৎ মনে হলো থামি।”

সাইফুল হাসল। “ভালো।”

একদিন অফিস থেকে ফিরছি। আবার সেই জায়গা দিয়ে যাচ্ছি।

চায়ের দোকান।

বুড়ো মানুষ নেই।

পায়রা আছে। কিন্তু কেউ দানা দিচ্ছে না।

দাঁড়িয়ে রইলাম।

অন্য মানুষ হাঁটছে। তাড়ায়।

আমি দাঁড়িয়ে আছি।

কিছু করছি না। কিছু ভাবছি না।

শুধু দাঁড়িয়ে আছি।

কেউ তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে অদ্ভুত লাগছে।

কিন্তু আমার ভালো লাগছে।

শুধু দাঁড়িয়ে থাকা। কিছু না করা।

কতক্ষণ?

জানি না। হয়তো দুই মিনিট। হয়তো পাঁচ মিনিট।

তারপর হাঁটলাম।

বাসায় গেলাম।

হ্যাপি বলল, “আজ আবার দেরি।”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় ছিলে?”

“রাস্তায়। দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

হ্যাপি কিছু বলল না। কিন্তু চোখ বলছিল, তুমি ঠিক আছো তো?

আছি কি?

জানি না।

কিন্তু ভালো লাগছে।

আরাশ এসে বলল, “আব্বু, তুমি আজকাল কেমন?”

“কেমন মানে?”

“কেমন যেন। আগে তুমি সবসময় ফোন দেখতে। এখন দেখো না।”

“লক্ষ্য করেছিস?”

“হ্যাঁ। আর তুমি মাঝে মাঝে শুধু বসে থাকো। কিছু করো না।”

“তোর কি খারাপ লাগছে?”

আরাশ বলল, “না। ভালো লাগছে। তুমি আগের চেয়ে বেশি এখানে আছো।”

এখানে আছি?

হ্যাঁ। হয়তো।

আগে শরীর ছিল। মন ছিল না।

এখন?

এখন মন একটু বেশি আছে।

কেন?

সেই বুড়ো মানুষ। পায়রা। তিন সেকেন্ড।

এত ছোট ঘটনা। কিন্তু কিছু একটা বদলে গেছে।

কী বদলেছে?

জানি না।

কিন্তু এখন মাঝে মাঝে থামি।

ফোন রাখি।

শুধু থাকি।

আকাশ দেখি। হাওয়া অনুভব করি। নিঃশ্বাস নিই।

এত সাধারণ।

কিন্তু এগুলো তো সবসময় ছিল।

শুধু আমি দেখিনি।

কারণ ব্যস্ত ছিলাম।

কিসে ব্যস্ত?

ইমেইল। মিটিং। কেনাকাটার তালিকা।

এগুলো এখনো আছে।

কিন্তু এখন এগুলোর মাঝে মাঝে থামি।

এবং সেই থামার মধ্যে কিছু আছে।

কী?

জানি না। নাম দিতে পারব না।

কিন্তু আছে।

একদিন আবার সেই জায়গা দিয়ে যাচ্ছি।

বুড়ো মানুষ আবার এসেছেন। পায়রাদের দানা দিচ্ছেন।

আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম।

তিনি আমার দিকে তাকালেন। হাসলেন। আলতো।

আমিও হাসলাম।

কোনো কথা হলো না।

কিন্তু কেমন যেন মনে হলো, তিনি জানেন আমি কেন দাঁড়িয়ে আছি।

এবং আমি জানি তিনি কেন এখানে বসে আছেন।

কোনো তাড়া নেই। কোনো অপেক্ষা নেই।

শুধু এই মুহূর্ত। পায়রা। দানা। পড়ন্ত বিকেল।

আমি হাঁটলাম।

কিন্তু ফোন দেখলাম না।

শুধু হাঁটলাম।

পা ফেলার শব্দ শুনলাম।

চারপাশ দেখলাম।

দোকান। মানুষ। গাছ। আকাশ।

সব সবসময় ছিল।

কিন্তু আমি দেখিনি।

এখন দেখছি।

কেন?

জানি না।

হয়তো সেই তিন সেকেন্ড।

যখন থেমেছিলাম। দেখেছিলাম। অনুভব করেছিলাম।

এবং সেই তিন সেকেন্ডে কিছু একটা ফাটল তৈরি হয়েছে।

কীসের ফাটল?

জানি না।

কিন্তু সেই ফাটল দিয়ে কিছু ঢুকছে।

হাওয়া। আলো। শব্দ।

জীবন।

হয়তো জীবন সবসময় এখানে ছিল।

কিন্তু আমি ব্যস্ত ছিলাম।

অন্যদিকে তাকিয়ে।

আগামীকাল। গতকাল। পরশু।

কিন্তু আজ?

আজ কোথায় ছিল?

কোথাও না।

এখন?

এখন মাঝে মাঝে আজ থাকে।

যখন থামি। যখন দেখি। যখন অনুভব করি।

হ্যাপি বলল, “তুমি আজকাল হাসো বেশি।”

“হাসি?”

“হ্যাঁ। আলতো হাসো। কিছু না ভেবে।”

হাসি কি?

হয়তো।

জানি না কেন হাসি।

কিন্তু ভালো লাগে।

আরাশ বলল, “আব্বু, আমরা কাল পার্কে যাব?”

“যাব।”

“সত্যি? তুমি তো বলো কাজ আছে।”

“কাজ আছে। কিন্তু যাব।”

আরাশ খুশি হলো।

আমিও খুশি হলাম।

কেন?

কারণ আমি থাকব। পার্কে। আরাশের সাথে।

ফোন দেখব না। ইমেইল ভাববো না।

শুধু থাকব।

এবং সেই থাকার মধ্যে কিছু আছে।

যেটা কাজের মধ্যে নেই।

যেটা ব্যস্ততার মধ্যে নেই।

শুধু আছে থাকার মধ্যে।

সেই বুড়ো মানুষ হয়তো জানেন না।

কিন্তু তিনি কিছু দিয়েছেন আমাকে।

কী?

নাম নেই।

কিন্তু আছে।

এবং সেটা আমার সাথে থাকবে।

প্রতিবার যখন থামব।

প্রতিবার যখন দেখব।

প্রতিবার যখন অনুভব করব।

এই মুহূর্ত।

যেটা সবসময় ছিল।

কিন্তু আমি দেখিনি।

এখন দেখছি।

মাঝে মাঝে।

এবং সেই মাঝে মাঝে যথেষ্ট।

কারণ সেখানে আছে জীবন।

যেটা আমি খুঁজছিলাম অন্য কোথাও।

কিন্তু ছিল এখানে।

সবসময়।

পায়রার সাথে।

বুড়ো মানুষের হাসিতে।

পড়ন্ত বিকেলের আলোতে।

তিন সেকেন্ডে।

যেটা হয়তো সারাজীবনের সমান।

হয়তো বেশি।

জানি না।

কিন্তু থাকব।

মাঝে মাঝে।

এবং সেটাই যথেষ্ট।

অভিজ্ঞতা জীবনের-পাঠ বর্তমানে-থাকা বাস্তবতা মননশীলতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

প্রেম

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *