আজ দুপুরে নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে এমন এক প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম যেটা আমাকে হতবাক করে দিয়েছে। ইন্টারভিউয়ার বলল, “আপনি তো অনেক কিছু জানেন। কিন্তু আপনি কী বোঝেন?” আমি মুখ হা করে বসে রইলাম। গুগলে সার্চ দিয়ে যে হাজারো তথ্য মুখস্থ করেছি, সেগুলোর কোনো মানে খুঁজে পেলাম না।
ফিরে এসে আরাশকে দেখি সে তার হোমওয়ার্ক করছে। কিন্তু বইয়ের দিকে তাকিয়ে নয়, ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখে। “কী করছিস?”
“বাবা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট। এখানে সব তথ্য পেয়ে যাচ্ছি।”
“কিন্তু তুই কী বুঝলি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে?”
আরাশ থেমে গেল। “মানে?”
“মানে হলো, তথ্য জানা আর বোঝা কি এক?”
আরাশ ভিডিওটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। “বাবা, আমি জানি একাত্তরে যুদ্ধ হয়েছে, ত্রিশ লাখ মানুষ মরেছে। কিন্তু বুঝি না কেন এত মানুষ মরতে রাজি হয়েছিল?”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ আপগ্রেড হলো। নাম “গর্ব ভার্সন ফাইনাল”।
“যারা যুদ্ধ করেছিল, তাদের বুকে ছিল স্বাধীনতার তৃষ্ণা। সেই তৃষ্ণা ইউটিউবে পাবি না।”
রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “আমাদের কাছে এত তথ্য, তবু কেন এত অজানা লাগে?”
“কেমন অজানা?”
“মানে, গুগল করলে জানতে পারি পৃথিবীর সব দেশের রাজধানী। কিন্তু জানি না কীভাবে সন্তানকে ভালোবাসতে হয়। জানি ক্যান্সারের চিকিৎসা কী, কিন্তু জানি না কীভাবে মৃত্যুর ভয় কাটিয়ে উঠতে হয়।”
হ্যাপি মৃদু হেসে বলল, “হায়দার, তথ্য ব্রেনে থাকে। জ্ঞান হার্টে থাকে। হার্ট তো গুগল করা যায় না।”
পরদিন অফিসে দেখি এক সহকর্মী উইকিপিডিয়া পড়ে সকলকে দর্শনের কথা বলছে। সে বলছে কান্ট, হেগেল এদের তত্ত্ব। কিন্তু তার মুখে কোনো শান্তি নেই। তথ্যের স্তূপ, কিন্তু প্রজ্ঞার চিহ্ন নেই।
আমি ভাবলাম আমার বাবার কথা। তিনি কখনো ইন্টারনেট দেখেননি। কিন্তু যখন আমাকে বলতেন “সততা সবচেয়ে বড় সম্পদ”, তখন সেই কথার ভেতর এমন গভীরতা থাকত যেন পুরো পৃথিবীর জ্ঞান লুকিয়ে আছে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই বলেছিলি যে জানিস না কেন মানুষ মুক্তিযুদ্ধে মরতে রাজি হয়েছিল। এখন কি বোঝ?”
“একটু একটু। কারণ তারা চেয়েছিল তাদের সন্তানরা মাথা উঁচু করে বাঁচুক।”
“এই বোঝাটা তুই কোথায় পেলি?”
“বাবা, তুমি যখন চাকরি ছাড়ো দুর্নীতির বিরুদ্ধে, তখন আমি ভাবি তুমি পাগল। কিন্তু পরে বুঝি তুমি চাও আমি একটা সৎ বাবার সন্তান হয়ে বড় হই।”
আমার চোখে জল এলো। এই ছেলেটা এমন একটা কথা বলল যেটা কোনো সার্চ ইঞ্জিনে লেখা নেই।
রাতে নামাজ পড়ে দোয়া করছিলাম। মনে হলো আল্লাহ বলছেন, “তোমার কাছে কুরআন আছে, হাদিস আছে। কিন্তু তুমি এগুলো পড় না অভিজ্ঞতা দিয়ে, পড় তথ্য দিয়ে। আমার আয়াতের মর্মার্থ তোমার জীবনের কষ্টের মধ্যে, সুখের মধ্যে।”
আমি বুঝলাম। তথ্যের সমুদ্রে আমরা ভেসে থাকি, কিন্তু জ্ঞানের জন্য তৃষ্ণার্ত। কারণ তথ্য আমাদের মাথা ভর্তি করে, কিন্তু হৃদয় ভর্তি করে না।
জ্ঞান আসে কষ্ট থেকে। অভিজ্ঞতা থেকে। ভুল করে শেখার মধ্যে। একজন মা তার সন্তানকে ভালোবাসা নিয়ে কোনো গবেষণাপত্র পড়েন না। তিনি রাতের পর রাত জেগে থেকে সেই ভালোবাসা শেখেন।
আমি এত বছর ভাবতাম তথ্য জানলেই জ্ঞানী হব। কিন্তু আজ বুঝলাম, জ্ঞান হলো অন্তরের আয়নায় প্রতিফলিত সত্য। সেই আয়না পরিষ্কার করতে হয় জীবনযাপন দিয়ে, গুগল সার্চ দিয়ে নয়।
তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সমুদ্রের নোনা জল খেলে হয় না। চাই মিঠা পানির এক ফোঁটা।
একটু ভাবনা রেখে যান