ব্লগ

বন্ধুদের তুলনার যন্ত্রণা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“তোমার বন্ধুরা এই বয়সে কী করে?” হ্যাপির এই প্রশ্নটা আমার কাছে একটা তীর হয়ে বিঁধে যায়। আমি জানি এই প্রশ্নের পেছনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তবুও এটা আমার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। যেন আমি যথেষ্ট সফল নই। যথেষ্ট এগিয়ে নেই।

গতকাল সাইফুলের কথা উঠল। সে নাকি কানাডায় একটা ভালো চাকরি পেয়েছে। বেতন আমার তিনগুণ। হ্যাপি বলল, “দেখ, সাইফুল কত এগিয়ে গেল। তুমি কেন এরকম চেষ্টা কর না?”

এই কথাটা শুনে আমার মনে হল যেন আমার সব অর্জন মিথ্যা হয়ে গেল। আমি যে কষ্ট করে একটা চাকরি ধরে রেখেছি, পরিবার চালাচ্ছি, সেসব যেন কিছুই না।

জামিউরের কথাও উঠে। সে নাকি নিজের বিজনেস শুরু করেছে। ভালো লাভ করছে। “জামিউর তো এত সাহস করল। তুমি কেন পার না?” এই প্রশ্নে আমার কোনো উত্তর নেই।

সত্য কথা হল, আমিও চেয়েছিলাম বিজনেস করতে। কিন্তু পুঁজি কোথায়? পরিবারের খরচ সামলিয়ে বিজনেসের জন্য টাকা কোথা থেকে আনব? এই ঝুঁকি নেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা আমার নেই।

কিন্তু এসব কথা বলতে পারি না। কারণ তাহলে মনে হবে আমি অজুহাত দিচ্ছি। সফল মানুষেরা তো অজুহাত দেয় না। তারা সমস্যার সমাধান করে।

মৃদুল এখন কানাডায়। সে ফেসবুকে যেসব ছবি পোস্ট করে, সেগুলো দেখলে মনে হয় সে স্বর্গে আছে। বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, সুন্দর লাইফস্টাইল। হ্যাপি বলে, “মৃদুল কত ভালো আছে। আমরাও যদি এমন কিছু করতাম।”

আমি বুঝি যে তুলনা মানুষের স্বভাব। সবাই অন্যদের সাথে নিজেদের তুলনা করে। কিন্তু এই তুলনায় আমি সব সময় পিছিয়ে থাকি। আমার সাফল্যের গল্প নেই যা দিয়ে গর্ব করতে পারি।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি অন্যদের মতো সফল হতে পারি না? আমার কি কোনো দোষ আছে?” কিন্তু উত্তর পাই না। শুধু মনে হয় যেন আমি নিজেকেই দোষারোপ করছি।

কখনো কখনো মনে হয় আমার বন্ধুদের সাফল্যের গল্প শুনতে শুনতে আমার নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি। আমি কী চাই, কী পারি – সেটা ভুলে গিয়ে অন্যদের মতো হতে চাই।

আরাশ একদিন শুনেছিল এমন কথাবার্তা। পরে এসে বলেছিল, “আব্বু, আপনি তো ভালো। অন্যদের সাথে তুলনা কেন করেন?” তার এই সহজ কথায় মনে হল যে আমার সন্তান আমাকে যেভাবে দেখে, সেটাই হয়তো আমার আসল পরিচয়।

সত্যি কথা বলতে, আমিও সুখী নই যখন বন্ধুরা এগিয়ে যায়। কিন্তু এই অসুখী লাগাটাও তো একধরনের পাপ। বন্ধুর সাফল্যে খুশি হওয়া উচিত। ঈর্ষা করা উচিত নয়।

একদিন জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা বলেছিলাম। সে বলেছিল, “আমিও কিন্তু তোর মতো স্থির জীবন চাই। বিজনেসের এত ঝামেলা। তোর মতো চাকরি থাকলে ভালো হত।” তার কথা শুনে বুঝলাম সবাই সবার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়।

হয়তো এটাই মানুষের স্বভাব। আমরা যা আছে সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি না। অন্যদের জীবন বেশি ভালো মনে হয়। কিন্তু আসলে হয়তো সবার জীবনেই সুখ-দুঃখ সমান।

আজকাল চেষ্টা করি হ্যাপির এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে বিরক্ত না হতে। বুঝার চেষ্টা করি যে সে আমার ভালো চায় বলেই এমন বলে। কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যা আছি, সেটাও কম নয়।

এক অর্থে আমি সফল। আমার একটা চাকরি আছে, একটা পরিবার আছে, একটা ছাদ আছে। স্বাস্থ্য ভালো। এগুলোও তো সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্য মাপার কোনো স্কেল নেই।

বন্ধুদের সাথে তুলনা হয়তো কখনো বন্ধ হবে না। কিন্তু চেষ্টা করব এই তুলনায় নিজেকে ছোট না করতে। আমার নিজস্ব যাত্রা আছে। সেই যাত্রায় আমি যতটুকু এসেছি, সেটাও কম নয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *