ব্লগ

উল্টো ঘড়ির সন্ধানে

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

দেয়ালের ঘড়িটা মারা গেছে তিনদিন হলো। কিন্তু আজ রাতে দেখি সেটা আবার টিক টিক করছে। শুধু একটা অদ্ভুত ব্যাপার – সুঁইটা উল্টো দিকে ঘুরছে।

বারোটার থেকে এগারোর দিকে। এগারো থেকে দশের দিকে।

মনে একটা পাগল প্রশ্ন জাগল – ঘড়ি যদি উল্টো দিকে ঘুরে, তাহলে জীবনও কি পিছনে যাবে?

যদি পিছনে যায়, তাহলে আমি কোথায় পৌঁছাতে চাই?

যেদিন আরাশ প্রথম “বাবা” বলেছিল? সেই মুহূর্তে ফিরে যেতে চাই। তখন আমি জানতাম না যে এই “বাবা” শব্দটার সাথে কত দায়বদ্ধতা জড়িত। শুধু জানতাম এক অসীম ভালোবাসা।

নাকি আরো পিছনে? যেদিন হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা? তখন মনে হয়েছিল এই মেয়েটার সাথে সব কিছু ভাগাভাগি করব। সব কথা বলব। এখন দেখি কিছুই বলতে পারি না।

হয়তো আরো পিছনে। বাবা মারা যাওয়ার আগের দিন? যেদিন তিনি বলেছিলেন, “জীবনটা সরল পথে চলবি।” আমি ভেবেছিলাম বুঝি গেছি। এখন বুঝি, সরল পথ বলে কিছু নেই।

ঘড়ির সুই ঘুরতে থাকে উল্টো দিকে। আর আমি ভাবি, এই জীবনে আমি কোন মুহূর্তে সবচেয়ে খুশি ছিলাম?

স্কুলে যখন প্রথম “ভালো” নম্বর পেয়েছিলাম? তখন মনে হয়েছিল পুরো পৃথিবী আমার। কিন্তু এখন জানি, সেই “ভালো” নম্বর আমাকে কোথায় নিয়ে গেছে।

নাকি আরো আগে? মায়ের কোলে যখন ঘুমাতাম? তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না, কোনো দ্বিধা ছিল না। শুধু ছিল নিরাপত্তা।

হ্যাপি ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরল। আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবি, সে কি জানে আমি এত কষ্টে আছি? নাকি আমার কষ্ট এত গোপন যে নিজেই জানি না?

ঘড়ির টিক টিক শব্দ মনে হচ্ছে উল্টো দিকের পদধ্বনি। যেন কেউ আমার জীবন থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। অথবা আমি পিছিয়ে যাচ্ছি জীবন থেকে।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, পিছনে গিয়েও আমি সেই মুহূর্তগুলো আলাদাভাবে বাঁচতে পারব না। কারণ সেই মুহূর্তেও আমি একই আমি ছিলাম। যে কথা বলতে পারে না। যে অনুভব করতে পারে কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না।

হয়তো ঘড়ি উল্টো ঘুরলেও জীবন পিছনে যায় না। হয়তো জীবন এমনই একটা জিনিস যেটা শুধু এগিয়ে যেতে জানে। আর আমরা মনে করি পিছনে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি যদি আবার জন্ম নিই, তাহলেও একই ভুল করব। একই নিরবতা, একই একাকীত্ব, একই যোগাযোগহীনতা।

কারণ সমস্যা সময়ে নয়। সমস্যা আমার ভেতরে।

ঘড়ি ঘুরুক উল্টো দিকে। আমি থাকব একই জায়গায় – নিজের কাছেই অচেনা।

তবু একটা স্বপ্ন দেখি। যদি সত্যিই পিছনে যেতে পারতাম, তাহলে সেই মুহূর্তে যেতাম যখন আমার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়নি। যখন আমার হাতের ইশারায় অর্থ ছিল। যখন আমার চোখে ভাষা ছিল।

হয়তো সেই মুহূর্তে আমি অন্য রাস্তা নিতে পারতাম।

কিন্তু কোন রাস্তা?

এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। হয়তো কোনোদিন জানব না।

ঘড়ি এখনো টিক টিক করছে উল্টো দিকে। আর আমি জেগে থাকি – এই আশায় যে হয়তো সকাল হলে সব কিছু বদলে যাবে।

যদিও জানি, ঘড়ি যেদিকেই ঘুরুক, আমি থেকে যাব আমিই।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *